Home » গীতাপাঠ ও চিকেন প্যাটিস : রাজনৈতিক ফতোয়া

গীতাপাঠ ও চিকেন প্যাটিস : রাজনৈতিক ফতোয়া

সময় কলকাতা ডেস্ক, ১০ ডিসেম্বর : কে কি খাবে তাও কি ঠিক করে দেবে রাজনৈতিক দল? প্রশ্ন এখন এটাই।

৭ ডিসেম্বর ব্রিগেডের মাঠে লক্ষ্ কণ্ঠে গীতা পাঠের আয়োজন চলাকালীন এক “মাংস ও পেঁয়াজ যুক্ত খাদ্য” বিক্রির জন্য স্ন্যাক্স বিক্রেতা হকার আক্রান্ত হয়েছেন।বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক বাড়ছে। গীতা পাঠ কালে হকারের আক্রান্ত হওয়া ও খাদ্য ফতোয়া জারির অভিযোগের তীর বিজেপির দিকে।

বিতর্ক শুধুমাত্র চিকেন নিয়েও নয়। অভিযোগ শুধু বিজেপির দিকেও নয়। এখন বিতর্ক ও প্রশ্ন,মানুষের খাবারের পাতে কী কী থাকবে তাও কি ঠিক করে দেবে বিজেপি বা রাজনৈতিক দলগুলি? উঠছে প্রশ্ন। গীতা পাঠের দিন হকার আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা এবং দেশ ও বঙ্গে খাদ্যাভ্যাসের উপরে একাধিক ফতোয়া তুলে দেখা যাক ঘটনা প্রবাহ কোন দিকে বইছে।

৭ ডিসেম্বর হওয়া ঘটনার ভাইরাল ভিডিওতে দেখা গিয়েছে, গেরুয়া পাগড়ির এক ব্যক্তি এক স্ন্যাক্স বিক্রেতাকে আক্রমণ করে। যোগ দেয় আরও কয়েকজন। তারা ঐ হকারের স্টিলের পাত্রে রাখা খাদ্য ছুঁড়ে ফেলে নষ্ট করে।

জানা যায় হকার তথা খাদ্য বিক্রেতার নাম শেখ রিয়াজুল। তিনি জানিয়েছেন, চিকেন প্যাটিস বিক্রি করছেন কিনা তা তার কাছে জানতে চাওয়া যায়। তার নাম জানতে চাওয়া হয়। এরপরেই তাঁকে মারধর করে তাঁর ৩০০০ টাকার খাদ্য সামগ্রী ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া হয়। তালতলার বাসিন্দা রিয়াজুল জানিয়েছেন যে তিনি ঘুরে ঘুরে ২২ বছর ধরে খাবার বিক্রি করে রুজি রুটির জোগাড় করেন।  শুধু রিয়াজুল নন, মুনতাজ মালিক, সালাউদ্দিন নামে আরও দুই সংখ্যালঘু খাবার বিক্রেতা  বলেছেন পেঁয়াজ সহ খাবার বিক্রি করা যাবে না জানিয়ে তাঁদের বাংলাদেশী আখ্যা দেওয়া হয়। রিয়াজুল ও সালাউদ্দিন পৃথক পৃথকভাবে থানায় অভিযোগ দায়ের করেছেন। বিষয়টি ঘিরে যে প্রশ্ন উঠছে তা থানা পুলিশের নয়, তা সংস্কৃতির ও মানবিকতার।

তরুণ বাম নেত্রী দীপ্সিতা ধর ইতিমধ্যেই আক্রান্ত বিক্রেতাদের পাশে দাঁড়াতে উদ্যোগ নিয়েছেন। তিনি বিষয়টিকে বাংলার সংস্কৃতির পরিপন্থী বলেই জানিয়েছেন। তৃণমূল জানিয়েছে, ঘৃণার রাজনীতির জন্ম দিচ্ছে বিজেপি।

অভিনেতা পরমব্রত চক্রবর্তীও বিতর্ক প্রসঙ্গে বাঙালিকে আমিষ ভোজী জাতি বর্ণনা করে বলেছেন, পেটের দায়ে খাবার ফিরি করা একজন হকারকে আক্রমণকে তিনি সমর্থন করেন না। বিষয়টি অন্যভাবে সমাধা করা যেত বলে তিনি ধিক্কার জানিয়েছেন শারীরিক নিগ্রহ কে।

এদিকে বিজেপি ঘটনার গতি প্রবাহ দেখে ঘটনাটির সঙ্গে নিজেদের দূরত্ব বাড়িয়েছে। এই বিষয়ে সরাসরি বক্তব্য দেওয়ার ক্ষেত্রে অধিকাংশ নেতাকেই ধরি মাছ না ছুঁই পানি নিতে দেখা গিয়েছে।

নেটিজেন মহলে অবশ্য জলঘোলা হচ্ছে। বিষয়টির পক্ষে ব্যাট ধরছেন কেউ কেউ, এরকম বক্তব্যও দেখা গিয়েছে যেখানে বিষয়টিকে পরিকল্পিত চক্রান্ত বলা হয়েছে। এও প্রশ্ন তোলা হয়েছে, ঈদগাহে নামাজ বিক্রির সময় নিষিদ্ধমাংস বিক্রি হলে তখন সংখ্যালঘুর ছেড়ে কথা বলতেন কি? এই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত আয়োজকরা কি বলছেন?

গীতাপাঠ অনুষ্ঠানের আয়োজক সংস্থা সনাতন সংস্কৃতি সংসদ হামলার ঘটনার নিন্দা জানিয়ে জানিয়েছে, “আমরা কোনও হিংসাকে সমর্থন করি না। মাঠ কোনও মন্দির বা আশ্রম নয়। কে কী খাবার বিক্রি করবে সেটা আমাদের নির্দেশে হয়নি। যারা হামলা করেছে, তাদের আইনের আওতায় আনা উচিত।

অর্থাৎ এই ঘটনায় বঙ্গে সরাসরি হালে পানি পাওয়া যাবে না বলে মনে করছেন বঙ্গ বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব। তথাপি বিষয়টি চিন্তা উদ্রেককারী মনে পড়ছে, মনন সম্পন্ন ও সংস্কৃতি সম্পন্ন মহল। বঙ্গের বাইরে এর আগেও বঙ্গসংস্কৃতি ও আমিষ খাদ্যসেবীর বিরুদ্ধে ফতোয়া আরএসএস বা বিজেপির নতুন নয়।

অতীতে বা সম্প্রতি এরকম ঘটনা একাধিক রয়েছে  যেখানে মাছ মাংস বিষয়ে বিজেপি ফতোয়া জারি করেছে।  দিল্লির শকুরপুরবস্তির বিজেপি বিধায়ক কর্ণেল সিং ‘ফতোয়া’ জারি করেন। এবছর নবরাত্রি চলাকালীন ২২ সেপেটম্বর থেকে ২ অক্টোবর পর্যন্ত বন্ধ রাখতে হবে মাছ-মাংসের দোকান, এমনটাই ফতোয়া জারি করেছিলেন তিনি। তিনি বলেছিলেন এ সময় রেস্তরাঁয় আমিষ খাবার বেচা চলবে না। অন্যথা হলে নাকি সনাতন বিশ্বাসে আঘাত লাগবে। অতীতে দেখা গিয়েছে, চিত্তরঞ্জন পার্কে মাছ বিক্রি নিয়ে বিজেপির নেতা নেত্রীরা আপত্তি তুলেছিলেন।

এত গেল বাইরের রাজ্যের কথা, ভঙ্গি যারা মনে করছেন এরকম বিষয় প্রথম তাঁরা বিজেপির এরকম অনেক নিদান ভুলে গিয়েছেন। এবছর ছট পুজো চলাকালীন ,  ২৬ ও ২৭ অক্টোবর অন্ডাল সাউথ বাজারে মাংস-সহ আমিষ দোকান বন্ধ রাখতে হবে বলে দোকানদারদের জানিয়েছিল  বিজেপির স্থানীয় নেতা-কর্মীরা। জেলা বিজেপির প্যাডে লেখা এইরকম একটি নির্দেশ পোস্ট করা হয় সমাজ মাধ্যমেও। পরবর্তীতে বিতর্ক দানা বাঁধলে বিষয়টিকে আবেদন বলে উল্লেখ করে স্থানীয় বিজেপি। একই ঘটনা ঘটে পশ্চিম বর্ধমানের রানিগঞ্জে,রানিগঞ্জ বিধানসভার ২ নম্বর মণ্ডলের সভাপতি রাখালচন্দ্র দাসের নেতৃত্বে ছটের সময়ে দু’দিন অন্ডাল দক্ষিণ ও উত্তর বাজারে রাস্তার ধারে মাছ ও মাংসের দোকান বন্ধ রাখতে হবে বলে নির্দেশ দেন। এ নিয়ে তৃণমূল রাস্তায় নামে।

তবে খালি বিজেপি কে দুষলেও হবে না, তৃণমূলও একই দোষে দুষ্ট এমন অভিযোগ রয়েছে। আসানসোলের সাংসদ শত্রুঘন সিনহা দেশের সমস্ত আমিষাশি খাওয়ার নিষিদ্ধ করে দেওয়া উচিত বলে মন্তব্য করে বিতর্ক তৈরি করেছিলেন।

তৃণমূল শাসিত নবদ্বীপ পুরসভার পক্ষে এবছর দোল উৎসবে উৎসব উপলক্ষে রাজ্যের শাসকদল পরিচালিত নবদ্বীপ পুরসভার আবেদন ঘিরে তৈরি হয় নতুন বিতর্ক। দোলের জন্য ১৩ থেকে ১৫ মার্চ, এই তিনদিন শহরে আমিষ বিক্রি এবং খাওয়াদাওয়া বর্জনের ডাক দেওয়া হল। পুরসভার পক্ষ থেকে তৃণমূলের পুরপ্রধান সে সময় বলেছিলেন, আমিষের বিষয়ে আইন করা সম্ভব নয় তবে একে আইন বলে মেনে নেওয়া উচিত। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলে থাকেন, যার যা খুশি খাবেন এবং খাদ্যাভাসে বহুত্ববাদের পক্ষে সওয়াল করেন অথচ তাঁর দলের পক্ষে খাদ্য ঘিরে ফতোয়া জারির উদাহরণ রয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলি যেন স্থির করে দিচ্ছে কে,কখন,কোথায় কি খাবে!

 

About Post Author