সময় কলকাতা, ২৩ ডিসেম্বর : বিতর্ক দানা বেঁধেছিল বহুদিন ধরেই। আবার তাকে উসকে দিলেন বঙ্গের রাজনৈতিক ময়দানে হাজির হুমায়ুন কবীর। প্রশ্ন আরও গভীর আকার নিয়েছে যা বহুদিন ধরেই প্রবল হচ্ছে। প্রশ্নের আরও গভীরে রয়েছে বিতর্ক। বিশ্বজুড়েই জয় শ্রী রাম বা আল্লাহকে স্মরণ করার মধ্যে রয়েছে পবিত্রতা আর নাশকতা মূলক কর্মকাণ্ডে তার ব্যবহার ঘিরে রয়েছে বিতর্ক ও আপত্তি। একেক ধর্মের একেকটি পবিত্র শব্দ অন্য ধর্মের কিছু মানুষের কাছে হয়ে উঠেছে আপত্তি ও পীড়ার কারণ। কিন্তু কেন? ধর্মীয় শব্দে অন্ধকারের ছায়া কেন?
” শুভেন্দু অধিকারী তিনবার জয় শ্রীরাম বললে আমি ছ’বার নারায়ে তকবীর বলবো ” – বক্তা হুমায়ুন কবীর। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, জয় শ্রীরাম হচ্ছে হিন্দুত্বর ক্ষেত্রে ধার্মিকতার ধ্বনি এবং বর্তমান প্রেক্ষাপটে মনে করা হচ্ছে “নারায়ে তকবীর, আল্লা হু আকবর ‘ এও মুসলিমদের ক্ষেত্রে আধ্যাত্মিকতার ধ্বনি। এতদূর ঠিকই আছে, তবে রাজনীতিতে দুই ধর্মের দুরকম আধ্যাত্মিক শব্দবন্ধ হয়ে উঠছে রাজনৈতিক স্লোগান। উঠছে প্রশ্ন। প্রশ্ন অন্যত্র, এক ধর্মের হয়ে অন্য ধর্মকে আঘাত করা বা নারকীয় কাজে ধর্মীয় ধ্বনির উচ্চারণ নিয়ে।
প্রাথমিকভাবে এবং একদা প্রশ্ন ছিল -ধর্মীয় তাস খেলতে গিয়ে রাম এবং আকবরকে ডেকে আনা খুব জরুরি? এই প্রশ্নের এখন আর কোন গ্রহণযোগ্যতা নেই কারণ মেকিয়াভেলি বা রাসেল ধর্ম ও রাজনীতিকে, ধর্ম ও রাষ্ট্রকে আলাদা করার কথা যতই বলে থাকুন, উপমহাদেশের বর্তমান আবহে ধর্ম ও রাজনীতি মিলেমিশে একাকার। স্বাভাবিক ভাবেই মনে হতে পারে হুমায়ুন কবীরের ধর্মীয় তাস খেলা অত্যন্ত স্বাভাবিক ঘটনা বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে। বঙ্গে ধর্মীয় তাস আর হাতের তালুতে রেখে ভোটের বৈতরণী পার হওয়ার চেষ্টা নয়, ধর্মীয় তাসকে সরাসরি সামনে তুলে ধরেছেন হুমায়ুন। তথাপি প্রশ্ন অন্যখানে,প্রশ্ন নৃশংস বা প্রতিশোধ মূলক কর্মকাণ্ডে ধর্মীয় পবিত্র শব্দ বন্ধের ব্যবহার ঘিরে।
রাম হিন্দুদের আরাধ্য দেবতা ও বিষ্ণুর সপ্তম অবতার। জয় শ্রী রাম সনাতনীদের পবিত্র ধ্বনি, তা কখনই কোন বিশেষ রাজনৈতিক দলের কুক্ষিগত হতে পারে না এবং অন্য ধর্মমতের কাছেও তা পীড়ার কারণ হওয়া উচিত না। অন্যদিকে, নারায়ে তাকবীর, আল্লাহু আকবার” একটি ইসলামিক শ্লোগান যার অর্থ হলো “উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা করো, আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ”; – আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ও মহিমা প্রকাশ করে এবং নামাজের সময়, আজান, উৎসব, বিপদ বা যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে ধ্বনি দেওয়া যায়। মুশকিল হল, বিভিন্ন জঙ্গি কার্যকলাপে নারা-এ- তকবীর ধ্বনি শোনা যাওয়ায় কেউ কেউ বিভিন্ন অহিংস প্রশ্ন তুলেছেন। কার্যত, ইসলাম ধর্ম গুরুরা বলে থাকেন – নারায়ে তাকবীর সর্বত্র উচ্চারণ করা না গেলে ও ,ঈদ, হজ, আজান,উৎসব এবং বিপদ থেকে উত্তরণের সময় এই ধ্বনি মুসলিম ধর্মাবলম্বীকে শান্তি ও শক্তি দেয়। সন্ত্রাসবাদীরা যখন তাদের মানবতা নিধন কর্মকাণ্ডে নারা-এ -তকবীর ধ্বনি উচ্চারণ করে তখন ইসলাম ধর্ম কলুষিত হয়। সংখ্যালঘু রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে বঙ্গের নওশাদ সিদ্দিকী বা মিমের আসিম ওয়াকাররা বারবার শান্তি বা আমনের কথা বলছেন এবং বিচ্ছিন্নতাবাদের বিরোধিতা করে বলেছেন- ইসলাম অশান্তির কথা বলে না । নওশাদের দিপু দাসের হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে নৌশাদের মত রাজনৈতিক নেতাদের প্রতিবাদের পাশাপাশি ইসলামের বিভিন্ন ধর্মগুরু সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সরব হচ্ছেন।
তথাপি, জঙ্গি কার্যকলাপ তো বটেই সাম্প্রতিক বাংলাদেশে একাধিক নারকীয় ঘটনায়, বিশ্বব্যাপী একাধিক জঙ্গি কার্যকলাপে উচ্চারিত হয়েছে নারা-এ-তকবীর ধ্বনি। আর এখানেই গোল বাঁধছে। ধার্মিকের ছদ্মবেশ নিচ্ছেন পিশাচেরা। বাংলাদেশের সংখ্যালঘুর উপরে আক্রমণ প্রবলতর হচ্ছে, ভারতেও উভয় ধর্মের মানুষ একে অন্যের উপর আক্রমণ হানছে সংকীর্ণ ধর্ম ভাবনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে। অনেক ক্ষেত্রে প্রতিশোধের জাগরণ মন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে আল্লা বা রামের ধ্বনি। মহারাষ্ট্রের কঙ্কাবলি সংখ্যালঘুর উপরে হামলায় , দিল্লির ক্রিস্টানদের ওপরে হামলায় বা গ্যাংস্টার হিসেবে অভিযুক্ত লরেন্স বিষ্ণই ও দিয়েছেন জয় শ্রীরাম ধ্বনি। এরকম নিদর্শন আছেই, এমনকি এরকমও আশ্চর্যজনক নিদর্শন রয়েছে যে, ইসরায়েলে মুসলিমদের বিরুদ্ধে বারবার উচ্চারণ করা হয়েছে জয় শ্রীরাম ধ্বনি।আবার, বাংলাদেশে নারা-এ-তকবীর ধ্বনিত হচ্ছে সংখ্যালঘুদের উপরে আক্রমণের সময়।
বিভিন্ন ধর্মমত সম্পর্কে বিশেষজ্ঞরা বলেন, সনাতনী ধর্মমতে কোথাও নেই প্রতিশোধের কথা, ইসলামেও সেকথা নেই বরং শান্তি সৌহার্দ্য এবং সৌভ্রাতৃত্বের কথা বলে ধর্ম। বাস্তবে যার সম্পূর্ণ প্রতিফলন ঘটছে না। তবে, দুটি ধর্মের উদারপন্থী ধর্মগুরুরা বলছেন যে, রাম বা নারা -এ – তাকবীর উচ্চারণ মানুষের ধর্ম ভাবনার পবিত্র প্রকাশ। তাঁরা বলছেন, সংকীর্ণ ধর্ম ভাবনায় আচ্ছন্ন হয়ে সন্ত্রাসবাদী মুসলিম বা হিন্দুরা যখন নারা -এ তকবীর বা রামের নাম উচ্চারণ করেন তখন তাঁরা ধর্মের পথ থেকে সরে আসেন, আর ঠিক তখনই অধর্ম বিপন্ন করে মানবতাকে।।


More Stories
তৃণমূল বিধায়ক ও সাংসদদের ভাবমূর্তি সমূলে ধ্বংস করে বড় জয় বিজেপির
ইন্ডিয়া জোটের বৈঠক : মমতা কি রক্ষাকবচ পেলেন?
বিস্ফোরক সাংসদ সুখেন্দু শেখরের ইস্তফা ও পদত্যাগ