সময় কলকাতা ডেস্ক, ১৯ সেপ্টেম্বরঃ কৈলাস পর্বত, যার পরতে পরতে রয়েছে রহস্যের ছোঁয়া। যে রহস্য কথা জনশ্রুতির হিসেবে ছড়িয়ে রয়েছে আবহমান কাল ধরে। পৌরাণিক কাল থেকেই কৈলাশ পর্বতে রহস্য নিয়ে পৌরাণিক কাব্য মহাকাব্য সহ একাধিক জায়গায় লিখিত হয়েছে বহু কথা। হিন্দু ধর্মীয় পুরাণে কৈলাস পর্বতকে বলা হয় শিবের লীলা ধাম ক্ষেত্র, আবার পৌরাণিক মতেই রয়েছে দেবাদিদেব মহাদেবের বসবাস এই কৈলাস পর্বতেই। হিন্দু শাস্ত্রমতে শিব ও তার সহধর্মিনী দুর্গা কার্তিক , গণেশ এবং শিবের অনুগামী ভক্তরা কৈলাস পর্বতেই বসবাস করেন। আবার বহু মানুষের মতে পৃথিবীর স্তম্ভ অর্থাৎ ভরকেন্দ্র এই কৈলাস পর্বত। তিব্বতের প্রচলিত প্রাচীন কিংবদন্তি হলো তিব্বতিদের মহাগুরু মিলারেপাই একমাত্র ব্যক্তি যিনি পা রাখতে পেরেছিলেন কৈলাস পর্বতের শীর্ষে। কৈলাস পরবর্তীতে ফিরে এসে তিনি নিষেধ করেছিলেন কৈলাস শৃঙ্গে যেন কোন ব্যক্তি না ওঠে। তখন থেকেই তিব্বতিদের মধ্যে ধারণা হয়েছিল কৈলাস পর্বত অজেয় এবং কৈলাস পর্বত সাধারন মানুষের জন্য নিষিদ্ধ।

এবার আসা যাক কৈলাস পর্বতের ভৌগোলিক ব্যাখ্যায়। তিব্বতের পশ্চিম প্রান্তে গ্যাংডিস পর্বতশ্রেণীর বুকে ২২০২৮ ফুট উচ্চতা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে কৈলাস পর্বত যা তিব্বতিদের ভাষায় গ্যাং রিনপোচে। কৈলাস পর্বত অনেকটাই পিরামিডের মতন দেখতে, গ্রানাইট ও চুনা পাথরে তৈরি এই পর্বতের পাদদেশে রয়েছে দুটি হ্রদ রাক্ষস তাল ও মানস সরোবর। মানস সরবর হ্রদটি মিষ্টি জলের হ্রদ, আবার রাক্ষস তাল হ্রদটি লবণাক্ত জলের হ্রদ। আকৃতির দিক থেকে দুটি হ্রদ ভিন্ন রূপের। মানস সরোবর হ্রদ গোলাকার সূর্যের আকৃতির মতন, আর রাক্ষস তাল হ্রদ অর্ধচন্দ্রের মতন। বহু মানুষের মতে আলো আর অন্ধকারের প্রতিনিধিত্ব করে এই দুটি হ্রদ। মানস সরোবর হ্রদ থেকে সিন্ধু গঙ্গা সতলজ নদী ও ব্রহ্মপুত্র নদের জন্ম হয়েছে। কৈলাস পর্বতের চারটি মুখ চার দিকে রয়েছে যেমন উত্তর দক্ষিণ পূর্ব এবং পশ্চিম দিকে মুখ করে আছে। বহু ধর্মপ্রাণ মানুষ এটা মনে করেন এই পর্বতে চারদিক থেকে বিভিন্ন শক্তি নির্গত হয়। কৈলাস পর্বতের পশ্চিম চুনি বা পদ্মরাগমণি দিয়ে এবং দক্ষিণ মুখ নীলকান্ত মণি দিয়ে উত্তর মুখ স্বর্ণ দিয়ে এবং পূর্ব মুখ ক্রিস্টাল বা স্পটিক দিয়ে গঠিত। এই ধারণার বশবর্তী হয়ে বহু মানুষ বিশ্বাস করেন যে কৈলাস পর্বতে রহস্যময় আদি শক্তি বিরাজমান।

এবার আসা যাক কৈলাস পর্বতের বিভিন্ন রহস্য প্রসঙ্গে। বহু মানুষের মতে কৈলাস পর্বত পৃথিবীর ভরকেন্দ্র। তার কারণ হিসেবে ধরা হয়, যুক্তরাজ্যের স্টোন হেঞ্জ থেকে এর দূরত্ব ৬৬৬৬ কিলোমিটার যা কৈলাস থেকে উত্তর মেরুর দূরত্ব সমান। আবার দক্ষিণ মেরু দূরত্ব ১৩ হাজার ৩৩২ কিলোমিটার যা উত্তর মেরু বা স্টোন হেনজের দূরত্বের ঠিক দ্বিগুণ। কিছু ধর্মপ্রাণ মানুষ এবং বিজ্ঞানীদের মতে কৈলাস পর্বতে এমন শক্তি রয়েছে যা শরীর এবং মনকে কখনও উদ্দীপ্ত করে এবং কখনও অবসাদগ্রস্থ করে। বহু পরীক্ষায় দেখা গিয়েছে যে কৈলাসের আশেপাশে যারা ১২ ঘন্টা সময়ের বেশি ব্যয় করেছেন তাদের চুল এবং নখের বৃদ্ধি স্বাভাবিক বৃদ্ধির থেকে বহু গুণ বেশি গতিতে হয়। পৌরাণিক মতে যেমন কৈলাস হলো মহাদেবের বাসস্থান তেমনি অনেকে মনে করেন পাণ্ডবেরা দ্রৌপদীর সঙ্গে মোক্ষ অর্জনের জন্য কৈলাস পর্বতেই আরোহন করেছিলেন। অর্থাৎ স্বর্গে যাওয়ার রাস্তা এই কৈলাস পর্বতেই রয়েছে। বহু পর্বত অভিযাত্রী কৈলাস পর্বতের পাদদেশে এসে দিকভ্রষ্ট হয়েছেন কারণ কৈলাস পর্বতের পাদদেশে কম্পাস সম্পূর্ণ অকেজ হয়ে যায়। সেক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিকদের ধারণা কৈলাস পর্বতে বিশাল আকারের ম্যাগনেটিক ফিল্ড রয়েছে।

বহু পর্বত অভিযাত্রী মতে কৈলাস পর্বতের পাদদেশে থাকাকালীন পর্বত থেকে এক অদ্ভুত আওয়াজ নির্গত হয়। যা অনেকটাই ওঁ শব্দের মত। অর্থাৎ শব্দের আদি শব্দ ওঁ কৈলাস পর্বত হইতে সৃষ্ট। বহু বিজ্ঞানী এবং গবেষকের মতে কৈলাস পর্বত আদতে মনুষ্য সৃষ্টি একটি ভ্যাকুয়াম পিরামিড। যা ১০০ টি ছোট ছোট পিরামিড দিয়ে বেষ্টিত। বৌদ্ধদের কাছে কৈলাস পর্বত খুবই পবিত্র পর্বত। কারণ তারা মনে করেন কৈলাস পর্বত হল সৃষ্টির প্রাণকেন্দ্র। বজ্রায়ন শাখার বৌদ্ধরা মনে করেন কৈলাস শৃঙ্গে ধ্যান মগ্ন থাকেন তাদের দেবতা হেরুকা চক্রসম্ভারা। তিব্বতের বন ধর্মের অনুসারীরা মনে করেন কৈলাস তাদের দেবতা সিপাইমেনের আবাসস্থল। আবার অনেকে মনে করেন তাদের প্রথম তীর্থঙ্কর ঋশভ দেব নির্বাণ লাভ করেছিলেন এই কৈলাস পর্বতেই। বহু পর্বত আরোহী কৈলাস পর্বতের গায়ে স্বস্তিকা চিহ্ন ও ওঁ চিহ্নে লক্ষণ পেয়েছেন। আবার বহু পর্বতারোহীর দাবি করেন কৈলাস পর্বতের একটি বিশেষ জায়গায় আলো ও ছায়ার মাঝে হাস্যরত শিবের মুখের অবয়ব দেখতে পেয়েছেন। কিছুটা বৈজ্ঞানিক ভিত্তি আর অধিকাংশই জনশ্রুতির কারণে দিনে দিনে কৈলাস পর্বত হয়ে উঠেছে এক রহস্যের মোড়া পবিত্র পর্বত।

এবার আসা যাক কৈলাস পর্বতের শিখর জয়ের অভিযান প্রসঙ্গে। তিব্বতিদের মতে মিলারেপা ও বনচুঙ পৌঁছে গিয়েছিলেন কৈলাস পর্বতের পাদদেশে। একমাত্র মিলেরেপাই পৌঁছতে পেরেছিলেন কৈলাস শৃঙ্গে। এত কেন পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে কৈলাস জয়ের কথা। কিন্তু বাস্তবিকভাবে কৈলাস জয়ের স্বপ্ন দেখেছিলেন ডক্টর আরনেস্ট মুন্ডাশেভ। ১৯৯৯ সালে এক বিশাল দল নিয়ে তিনি এসেছিলেন কৈলাস পর্বতের পাদদেশে। তিনি তার বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে জানিয়েছিলেন রাতের অন্ধকারে পাল্টে যায় সম্পূর্ণ কৈলাস পর্বত হার হিম করা আওয়াজ ভেসে আস্তে থাকে কৈলাস পর্বতের দিক থেকে। তিনি গভীর অনুসন্ধান চালিয়েছিলেন কৈলাস পর্বতের আশেপাশের অঞ্চলে কথা বলেছিলেন বহু ঋষি এবং স্থানীয় মানুষের সঙ্গে। মুন্ডাশেভের বক্তব্য অনুযায়ী কৈলাস পর্বত কোন প্রাকৃতিক পর্বত নয়। এটি একটি মনুষ্য সৃষ্ট পর্বত যার ভিতর থাকতে পারে বৌদ্ধ ধর্মের মহাপুরুষদের গোপন নগর জ্ঞানগঞ্জ বা সাম্ভালা। যদিও এই বক্তব্যের স্বপক্ষে আজ পর্যন্ত কোন যুক্তি পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে কৈলাস পর্বতে আরোহন করতে এসেছিলেন উইলসন ও শেরপা সাতান। আধুনিক প্রযুক্তি এবং অদম্য সাহস নিয়ে তারা খুঁজে বের করেছিলেন কৈলাস শৃঙ্গে ওঠার এক নতুন পথ।
আরও পড়ুন ইতিহাস খ্যাত নবাব ওয়াজিদ আলি শাহ

কিছুটা ওঠার পরই তাদের সামনে নেমে এসেছিল বিশাল বিপর্যয়। আচমকাই আবহাওয়ার পরিবর্তন ঘটে ঘন অন্ধকারে ঢেকে যায় আশেপাশের অঞ্চল। কোনক্রমে প্রাণ বাঁচিয়ে ফিরে এসেছিলেন এই দুই পর্বত আরোহী এরপরেও কয়েকবার চেষ্টা করেছিলেন তারা কিন্তু একটি নির্দিষ্ট স্থান পর্যন্ত পৌঁছানোর পরেই আর এগোতে সক্ষম হননি এই দুই পর্বতারোহী। উইলসনের কৈলাস অভিযানের বহু বছর বাদে ১৯৩৬ সালে কৈলাস শৃঙ্গ জয় করার চেষ্টা করেছিলেন হারবাট টিচি। অস্ট্রিয়ার এ পর্বতারোহী কৈলাস শৃঙ্গে আরোহনের চেষ্টার পর ব্যর্থ হয়ে তিনি বলেছিলেন একমাত্র পাপমুক্ত মানুষই পা রাখতে পারবেন এই কৈলাস শৃঙ্গে। তৎকালীন সময়ে পৃথিবীর সবচেয়ে নামকরা পর্বতারোহী ছিলেন ইতালির রেইনহোল্ট মেসনার। সেই মেসনারকে কৈলা শৃঙ্গ জয় করার আহ্বান জানিয়েছিল চীন।। সমস্ত কিছু শুনে এবং অনুধাবন করে মেসনার চীনের এই আহ্বানকে অস্বীকার করে। ১৯৯১ সালে চীন ও জাপান একত্রিতভাবে কৈলাস অভিযানের জন্য প্রস্তুত হয়।। ১৭ জনের একটি বিজ্ঞানী দলকে তারা পাঠায় কৈলাস অভিযানে। কিন্তু এক ভয়ঙ্কর তুষার ধসে মারা যান ১৭ জন বিজ্ঞানী।

চীনের তরফ থেকে হেলিকপ্টার করে কৈলাস শৃঙ্গ পর্যবেক্ষণ করার জন্য একটি হেলিকপ্টার পাঠায়।। মূলত কৈলাস শৃঙ্গের উপর হেলিকপ্টার এবং কোন বিমান চলাচল কার্যত নিষিদ্ধ। তার কারণ অত্যাধিক খারাপ আবহাওয়া কোন বিমান বাহ হেলিকপ্টার চলাচল করতে পারেনা কৈলাস পর্বতের উপর দিয়ে। কিন্তু চীন যে হেলিকপ্টারটি পাঠিয়েছিল কৈলাস শৃঙ্গ দেখার জন্য, সেই হেলিকপ্টার কৈলাস শৃঙ্গে উপর ওঠার পরেই আবহাওয়া এবং কম্পাস খারাপ হওয়ায় ফিরে আসতে বাধ্য হয়। স্পেন ও জাপান এক পর্বত আরোহী দল পাঠানোর জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল। মূলত ইতালির বিখ্যাত পর্বত আরোহী মেসনারের অনুরোধে সেই অভিযান বাতিল করা হয়। তারপর থেকে চীন ,ভারত এবং তিব্বতের পক্ষ থেকে জানিয়ে দেওয়া হয় কৈলাস অভিযান জন্য নিষিদ্ধ। কৈলাস পর্বতের পাদদেশ পর্যন্ত আজ বহু মানুষইথ যেতে সক্ষম কিন্তু কৈলাস পর্বতের শৃঙ্গে ওঠার চেষ্টা? কার্যত অসম্ভব। এ কথা মেনে নিয়েছে পর্বত আরোহী সহ সাধারণ মানুষ। ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাত লাগতে পারে এটা শুধুমাত্র কারণ নয়, কৈলাস শৃঙ্গে ওঠা অসম্ভব কারণ কৈলাস নিজেই অজানা রহস্য ঘেরা। হঠাৎ আবহাওয়ার পরিবর্তন, কম্পাস দিক নির্ণয় বন্ধ করে দেওয়া, পরবর্তীতে ভেসে আসা অজানা শব্দ, বিপদ সংকুল রাস্তা কৈলাস পর্বত কে করে তুলেছে অজেয়। শুধু আজ নয় যুগের পর যোগ হয়তো কৈলাস পর্বতের এই রহস্য নিয়ে আলোচনা চলতেই থাকবে।


More Stories
ভারতরত্ন সম্মান : ইতিহাস ও বিতর্ক
“ইতিহাসের পাতা থেকে” কালজয়ী : সাহিত্যের মণিমুক্তো
কলকাতা বইমেলা থিম আর্জেন্টিনা : মেসিকে চেনেন, এঁদের চেনেন কি?