Home » গা ছমছমে সৌন্দর্য নিয়ে বিরাজমান ৫১ পীঠের অন্যতম ভ্রামরী দেবীর মন্দির

গা ছমছমে সৌন্দর্য নিয়ে বিরাজমান ৫১ পীঠের অন্যতম ভ্রামরী দেবীর মন্দির

সানী রায়, সময় কলকাতা, ২৭ অক্টোবর : শালবাড়ির বিখ্যাত শালবন, জোড়াবট-খ্যাত ঘন জঙ্গল, কিছু দূরে তিস্তা নদী  আর চা বাগান। কোথাও গা ছমছমে পরিবেশ, কোথাও আবার অপার সৌন্দর্য প্রকৃতির। এতসবকিছুর মধ্যে স্বমহিমায় বিরাজ করছে জলপাইগুড়ির রাজগঞ্জ ব্লকের শালবাড়ির ভ্রামরী দেবীর মন্দির। শিকারপুর দেবী চৌধুরানীর মন্দিরের মতই ঐতিহ্যশালী ভ্রামরী দেবীর মন্দির। আধ্যাত্মিকতায় ভরপুর সতীর ৫১ পীঠের অন্যতম ভ্রামরী দেবীর মন্দির। কিছুটা লোকচক্ষুর অন্তরালে হলেও পর্যটকরা আসেন, তবুও বিস্তারিত চর্চার অভাবে সেঅর্থে ভিড় হয় না।অথচ কামাখ্যা- কালীঘাটের মত শালবাড়ীর ভ্রামরী দেবীর মন্দিরও হয়ে উঠতে পারত অতি প্রসিদ্ধ তীর্থস্থান। দেবী এখানে প্রচারের অভাবে এখনও রয়ে গেছে যেন অবহেলাতে। তবুও অনন্য ভ্রামরী দেবীর মন্দির।

দূর দূরান্ত থেকে বহু মানুষ, সাধু-সন্ন্যাসীরা মাঝেমধ্যেই ভ্রামরী দেবীর আসেন, নিজেরাই উদ্যোগ নিয়ে আয়োজন করেন পুজোর। ধুমধাম করে না হলেও, রাত জেগে চলে হোম যজ্ঞ, চন্ডীপাঠ । সকলেই মনে করেন যে, দেবী মা খুবই জাগ্রত এখানে। স্থানীয় বাসিন্দা বিশ্বেশ্বর রায় বলেন, “আমার নিজের বয়স এখন ৭৪ বছর, বাপ ঠাকুরদার মুখেও শুনেছি এই মন্দিরের জাগ্রত মায়ের কথা।”

জানা যায় বেশ কিছু বছর আগে জিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার হেডকোয়ার্টার কলকাতা থেকে তাপস সাধ্য ও দিলীপ চৌধুরী নামে দুই আধিকারিক এসেছিলেন এই মন্দির পরিদর্শন করতে। তাঁরা এলাকাবাসীকে বুঝিয়ে দিয়ে যান এই মন্দিরের গুরুত্ব। এলাকার এক বাসিন্দা ও মন্দির পূজা কমিটির অন্যতম সদস্য হিরু রায় বলেন, আজ থেকে প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে এখানে এক মহারাজ আসেন।  লাল কাপড় পরা মাথা থেকে পা অব্দি তাঁর বিশাল জটা । তিনি দীর্ঘদিন এই মন্দিরে থেকে পুজো করেন রাত জেগে। সে সময় তিনি প্রথম দেখিয়ে দিয়ে যান তিনটি মোটা গাছের গুড়ির নিচে অবস্থিত পাথরে পরিণত হওয়া দেবীর বাঁ পা। এরপর শুধু পশ্চিমবঙ্গই নয়, ভারবর্ষের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এই মন্দিরে আসতে শুরু করেন বিভিন্ন সাধু সন্তরা। সে যুগে বাইরে থেকে আসা মানুষেরা ফালাকাটা স্টেশনের দেওয়ালের গায়ে এঁকে রেখে যান মন্দিরের একটি ম্যাপ। ভ্রামরী দেবীর মন্দির নিয়ে মানুষের আগ্রহ বাড়তে থাকে, বাড়ে পরিচিতি

 

ভ্রামরী দেবীর মন্দির নিয়ে জানতে হলে জানা দরকার ৫১ পীঠের কথা। কথিত আছে, দক্ষ রাজার কন্যা সতী তাঁর স্বামী মহাদেব শিবের অপমান সহ্য করতে না পেরে রাজার আয়োজন করা যজ্ঞের আগুনে নিজেকে আহুতি দেন। ফলে মহাদেব প্রচণ্ড রেগে যান আর লন্ডভন্ড করে দেন সেই যজ্ঞ। রুদ্ররূপ ধারণ করে পৃথিবী জুড়ে সতীর দেহ কাঁধে নিয়ে প্রচণ্ড প্রলয় তান্ডব নৃত্য করতে থাকেন। ফলে পৃথিবীতে শুরু হয় এক ভয়ংকর দূর্যোগের। মর্তের জীবকুলের কথা ভেবে চিন্তায় পড়ে যান সমস্ত দেব দেবীরা। সে সময় ভগবান বিষ্ণু পৃথিবী ধ্বংস হবার ভয়ে, সেই প্রচন্ড প্রলয় থামাতে, সুদর্শন চক্র পাঠিয়ে দেন। সুদর্শন চক্র দ্বারা দেবী সতী মৃতদেহ ছেদন করেন। এতে সতী মাতার দেহখণ্ডসমূহ ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন জায়গায় পড়ে। শুধ ভারতবর্ষেই নয়, ববর্তমান আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, নেপাল ও শ্রীলংকাতেও রয়েছে এই ৫১পিঠের অংশ। এই পবিত্র পীঠস্থান গুলিই ৫১টি শক্তিপীঠ হিসেবে পরিচিত। মানুষের বিশ্বাস অনুযায়ী, শক্তিপীঠ নামের তীর্থ স্থান গুলিতে দেবী দাক্ষায়ণী সতীর দেহের নানান অঙ্গ পাথরে পরিণত হয়ে রক্ষিত আছে। জলপাইগুড়ি জেলার ধূপগুড়ি ব্লকের গাদং ২ নং গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার পুরনো শালবাড়িতে অবস্থিত এই ভ্রমরী দেবীর মন্দির। ধূপগুড়ি শহর থেকে মাত্র ৮ কিলোমিটার দূরে শালবাড়ি গ্রাম। ৩১ নং জাতীয় সড়কের পাশে অবস্থিত শালবাড়ি উচ্চ বিদ্যালয়ের খেলার মাঠের অদূরেই এই শক্তীপিঠ। পাশ দিয়ে বয়ে গেছে গিলান্ডি নদী। এই নদীর বাঁধ ধরেই অবস্থিত এই মন্দির। লোক মুখে কথিত আছে দেবী ভ্রমরীর কাছে মানত করলে, তার সুফল মিলবেই। এখানকার মানুষ মনে করেন সতীর বাম পা রয়েছে এই মন্দেরে।

বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, ৫১টি শক্তিপীঠের কথা বলা হয়ে থাকলেও, শাস্ত্রভেদে এই পীঠ গুলির সংখ্যা ও অবস্থান নিয়ে বহু মতভেদ আছে। যেমন পীঠনির্ণয় তন্ত্র নামক একটি গ্রন্থে শক্তিপীঠের সংখ্যা ৫১টি। আবার শিবচরিতগ্রন্থে ৫১টি শক্তিপীঠের পাশাপাশি ২৬টি উপপীঠের কথাও বলা হয়েছে। বাংলা পঞ্জিকা এবং আরও কয়েকটি ধর্ম গ্রন্থে উল্লেখ আছে ত্রিস্রোতা নদীর পাশে শালবাড়ি গ্রামে অবস্থিত ভ্রামরী দেবীর মন্দিরে আছে দেবীর বাম পদ। আবার আরও একটি সূত্র থেকে যানা যায় জলপাইগুড়ি জেলার বোদাগঞ্জেও রয়েছে দেবীর বাঁ পা। তাই এই নিয়ে রয়েছে প্রচুর তর্ক-বিতর্কও। তবে এখানে মন্দির গড়ে উঠলে শালবাড়িও হয়ে উঠতে পারে এক পবিত্র তীর্থ স্থান,  ভ্রামরী দেবীর মন্দির পর্যটনের কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে আধ্যাত্মিকতা আর সৌন্দর্যের মিশেলে ।।

আরও পড়ুন কমলা হ্যারিস প্রেসিডেন্ট হলে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ নিশ্চিত : ট্রাম্প

 

About Post Author