পুরন্দর চক্রবর্তী,সময় কলকাতা :রামনাথ বিশ্বাস নামটির সাথে জড়িয়ে আছে অবিশ্বাস্য রূপকথা। সাইকেলে বিশ্বজয় করে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন ভু-পর্যটক রামনাথ বিশ্বাস। দু চাকার সাইকেলে পৃথিবী ভ্রমণ করা রামনাথ বিশ্বাস ছিলেন এক বর্ণময় চরিত্র। একাধারে তিনি ছিলেন বিপ্লবী, সৈনিক ও গ্রন্থলেখক।১২৮ বছর আগে ১৩ জানুয়ারির দিনটিতে আসামের বানিয়াচং গ্রামে জন্ম তাঁর যা বর্তমান বাংলাদেশের সিলেটের অন্তর্গত।দুচাকার সাইকেলে ভর করে তিনি সারাপৃথিবী ঘুরে বেড়িয়েছেন।ভুপর্যটক হলেও আদতে তিনি যা করতেন তা এক অর্থে ছিল সাংবাদিকতা।তাঁর সাইকেলে চেপে দু চোখ ভরে বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে সংবাদ তুলে এনেছেন যত্ন করে যা তাঁর ভ্রমণ বর্ণনার মধ্যে পরিবেশন করেছেন।
তিনি দেশের গন্ডির মধ্যে নিজেকে আবদ্ধ রাখেন নি।ভারত, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, মেসোপটেমিয়ার বিভিন্ন স্থানে কর্মজীবনের প্রারম্ভেই তিনি ঘোরাঘুরি করেছিলেন।তাঁর তিনদফায় বিশ্বভ্রমণ ছিল মূলত তাঁর মধ্যবয়সে। আটবছর সময়কালে ধরে তাঁর বিশ্ব ভ্রমণ আর সেই অভিজ্ঞতার ফসল তাঁর রচনাসমৃদ্ধ ৩০টির বেশি বই। আফগানিস্তান ভ্রমন,অন্ধকারের আফ্রিকা,আজকের আমেরিকা,জুজুৎসু জাপান,দুরন্ত দক্ষিণ আফ্রিকা, লাল চীন, বেদুইনের দেশে,ট্যুর রাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড উইদাউট মান,ভবঘুরের বিশ্বভ্রমণ,ভিয়েতনামের বিদ্রোহী বীর,মালয়েশিয়া ভ্রমণ প্রভৃতি পুস্তকের নামে চোখ বোলালেই বোঝা যায় বিরাট পৃথিবীকে চষে ফেলেছেন জীবনভর।

যে বয়সে ঘরকুনো বাঙালি শুয়ে বসে থিতু জীবনের স্বপ্ন দেখে তখন বিশ্বভ্রমণে রত ছিলেন তিনি।আর এই দুনিয়া দেখার নেশায় তিনি প্রত্যক্ষ করেন দেশ বিদেশের বাস্তবকে।চাক্ষুস করেন দেশ দুনিয়ার প্রকৃত অবস্থাকে।আর সেই বর্ণনা সাবলীল ভাবে স্থান পেয়েছে তাঁর “আফগানিস্তান ভ্রমণ”গ্রন্থেও।তিনি তাঁর গ্রন্থে এক জায়গায় আফগানিস্তান সম্পর্কে লিখেছেন, “সাইকেল চলছে। আমার পায়ে শক্তি আছে।নতুন দেশের নতুন গন্ধে মাতোয়ারা হয়ে পথ চলছি।ভয়ানক অনুতাপ হচ্ছিল আফগানিস্তান সম্বন্ধে নানা বিকৃত এবং কল্পনাপ্রসূত কাহিনী এককালে বিশ্বাস করেছিলাম বলে।কোথায় ডাকাতের অত্যাচার আর কোথায় হিন্দুবিদ্বেষ?”
রামনাথ বিশ্বাসের প্রথম জীবনে স্বদেশী বিপ্লবী যোগ জানাজানি হওয়ায় চাকরি গেলেও দমে থাকেননি তিনি।মিত্র বাহিনীর সৈনিক হিসেবে প্রথম বিশ্ব যুদ্ধেও যোগদান করেন তিনি।নৌবাহিনীতেও কাজ করেছেন রামনাথ বিশ্বাস।অতঃপর দেশ ও দুনিয়া পর্যটন করেন সাংবাদিকের চোখ নিয়ে। আর তাঁর আশ্চর্য সব ঘটনার বিবরণ রয়েছে তাঁর লেখা বিভিন্ন গ্রন্থে।
রামনাথ বিশ্বাসের সাইকেলে চেপে শুরু করেন ১৯৩১ সালের প্রথম বিশ্বভ্রমণ । সেদিন তাঁর সঙ্গী ছিল এক জোড়া চটি, দু’টি চাদর। আর ছিল সাইকেলটি যার কেরিয়ারে একটি বাক্সে সাইকেল মেরামতির সরঞ্জাম। সাইকেলের গায়ে লেখা ‘রাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড, হিন্দু ট্রাভেলার।’৭ জুলাই ১৯৩১ রামনাথ সিঙ্গাপুরের কুইন স্ট্রীট থেকে এই বিশ্বযাত্রা শুরু করেন।সিঙ্গাপুরে চাকুরীরত প্রবাসী ভারতীয়রা রামনাথকে সেদিন শুভেচ্ছা জানাতে এসেছিলেন। সাইকেলে চড়ে তিনি মালয়েশিয়া, চীন, কোরিয়া, জাপান হয়ে কানাডায় পৌঁছান। ১৯৩৩ সালে শেষ হওয়া প্রথম ভ্রমণ পর্ব শেষ হতেই দেশে ফেরেন তিনি।দেশে ফিরেও থেমে থাকেন নি রামনাথ ।কিছুদিনের মধ্যেই তিনি দ্বিতীয়বার বিশ্বযাত্রা করেন।সেবার তিনি আফগানিস্তান, পারস্য, ইরাক, সিরিয়া, লেবানন, তুরস্ক, বুলগেরিয়া, যুগোস্লাভিয়া, হাঙ্গেরী, অস্ট্রিয়া, চেকোস্লোভাকিয়া, জার্মানি, হল্যান্ড, বেলজিয়াম, ফ্রান্স হয়ে বৃটেন পৌঁছান। ইংল্যান্ড ও স্কটল্যান্ডও তিনি সাইকেলে পরিভ্রমণ করেন। এই যাত্রায় তার শরীর ভেঙে গিয়েছিল। ১৯৩৬ সালে তিনি লন্ডন থেকে জাহাজে পোর্ট সৈয়দ হয়ে মুম্বইয়ে প্রত্যাবর্তন করেন। সুস্থ হয়ে তিনি শান্তিনিকেতনে কবিগুরুর কাছে যান।১৯৩৮ সালের তৃতীয়বার বিশ্বযাত্রা সেবার তিনি আফ্রিকা মহাদেশে পাড়ি দেন। মুম্বই থেকে তিনি জাহাজে মোম্বাসায় পৌঁছে সেখান থেকে সাইকেল যাত্রা শুরু করেন। তিনি কেনিয়া, উগান্ডা, নায়াসাল্যান্ড, রোডেসিয়া হয়ে দক্ষিণ আফ্রিকায় পৌঁছান। এরপরে আমেরিকা যান তিনি । ১৯৪০ সালে দেশে ফিরে আসেন রামনাথ ।
রামনাথ ছোট দেশকালের গন্ডিতে নিজেকে আবদ্ধ রাখেন নি। হিন্দু বাঙালি পর্যটক হিসেবে দেশে বিদেশে নিজেকে পরিচয় দিতেন তিনি।প্রবল জ্যাত্যাভিমান বজায় রাখলেও ভেদাভেদ রাখেন নি জাতিতে। বরং আফ্রিকায় গিয়ে ভারতীয়দের সাথে বিবাদ করেছেন কালোবর্ণের মানুষদের পৃথক করার ঘটনায়। একাধিকবার তাঁর লেখায় হিন্দুদের মানসিকতার সমালোচনা প্রকাশ পেয়েছে।তবে তিনি দেশের উর্দ্ধে বৃহত্তর পৃথিবীর বাসিন্দা তাই তিনি আফগানদের কাছে বলেন তিনি এসেছেন বাংলা থেকে। সংকীর্ণ বিভেদের বেড়াজাল থেকে মুক্ত ভুপর্যটক রামনাথ বিশ্বাস ছিলেন সম্ভবত প্রথম আন্তর্জাতিক মানের ভারতীয় সংবাদ সংগ্রাহক। তাঁর চোখ দিয়ে আজও আমরা বিশ্ব দর্শন করি। দু চাকায় পাড়ি দিয়ে তাঁর সংগৃহীত তথ্য সেযুগের এক প্রামাণ্য ইতিহাসও বটে।।


More Stories
বাংলা নববর্ষের ইতিহাস
আরেক অভিনেতা প্রণবের অকালপ্রয়াণ
বেজি কি সাপের বিষে কাবু হয় না?