পুরন্দর চক্রবর্তী,সময় কলকাতা: ” তুমি তোমার ছবিটি আঁকো দিবাবসানে অথবা মেঘলা বা কুয়াশাচ্ছন্ন দিনে “- লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চি
ঠিক এগারো বছর আগের ঘটনা। চিত্রকলা জগতে তো বটেই, দুনিয়াজুড়ে হইচই পড়ে যায় একটি ছোট্ট খবরে। যখন ইতালির একদল গবেষক ঠিক করলেন ইতালির ফ্লোরেন্সে লা জিয়োকোন্দার সন্ধানে লিসা ঘেরারদিনির দেহাবশেষ একটি মঠে খুঁজে বের করার চেষ্টা করবেন। সেখানে নাকি শায়িত আছে তাঁর দেহ। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি মেনেই হাড়গোড় খুঁজে ডিএনএ মিলিয়ে নিশ্চিত করা হবে তাঁর অস্তিত্ব।পাঠকদের মনে হতেই পারে লা জিয়োকোন্দা কে? লা জিয়োকোন্দার পরিচয় যদিও আজও সঠিক ভাবে বলা সম্ভবপর হয় নি তবে পাঠকদের সুবিধার্থে বলা ভালো ইতালিয়ান ভাষায় যিনি লা জিয়োকোন্দা তিনি দুনিয়াবাসীর কাছে মোনালিসা নামে পরিচিত। লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চির অমর শিল্পকর্ম মোনালিসাকে নিয়ে এযাবৎ কাল যত আলোচনা হয়েছে শিল্পের জন্মলগ্ন থেকে তার ছিটেফোঁটাও অন্য যেকোনো ছবিকে নিয়ে করা হয়েছে কিনা সন্দেহ।
“দুঃখী মানবেরা চোখ খুলে দেখো” এই অসামান্য শব্দবন্ধ যার রচনা, সেই অসামান্য বিস্ময়পুরুষ লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চির মুল পরিচিতি ছিল চিত্রকর হিসেবেই। যদিও লেখক, বিজ্ঞানী বা প্রযুক্তিবিদ হিসেবেও কোনও অংশে কম যান না ভিঞ্চি তথাপি তাঁর চিত্রকলা জন্যই তিনি সমধিক আলোচিত।তাঁর লাস্ট সাপার বা ভারজিন অফ দ্যা রকসের মত চিত্রকলাকে ছাপিয়ে তাঁকে সবচেয়ে বেশি খ্যাতি এনে দিয়েছে লা জিয়োকোন্দা । আর এই লা জিয়োকোন্দা বা মোনালিসা নিয়ে চর্চার অন্ত নেই। নেই বিতর্কের অবসান।মোনালিসা ছবিটির মডেল তাহ’লে কে? তাবড় তাবড় গবেষক এনিয়ে গবেষণা করেছেন, নিজেদের বক্তব্য উপস্থাপিত করেছেন। কিন্তু আজও মোনালিসার রহস্য কিছুতেই সম্পূর্ণ সমাধান হয় নি।
অনেকের মতেই লা জিয়োকোন্দা আদতে ছিলেন লিসা ঘেরারদিনি। লিসা ঘেরারদিনি বা মোনালিসা যাই বলা হোক না কেন, বিরাট অংশের গবেষক মনে করেন যে লা জিয়োকোন্দা ছিলেন রেশম ব্যবসায়ী ফ্রান্সেস্কো দেল জিয়োকোন্দার স্ত্রী। ঐতিহাসিক তত্ত্ব মানলে ধরে নেওয়া যেতে পারে লিসা ঘেরারদিনির জন্ম ১৪৭৯ সালে। মৃত্যু ১৫৪২ সালে। অথচ প্রকৃত পক্ষে লা জিয়োকোন্দার অস্তিত্ব যেন কিছুতেই সুনিশ্চিত হয় না।

মনে রাখা দরকার, মোনালিসার স্রষ্টা ও ঠিক আজ থেকে ৫৭০ বছর আগে (১৪৫২ খ্রিস্টাব্দের )১৫ এপ্রিল জন্মগ্রহণ করা লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চি ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী।তার বহুচর্চিত “আংঘিয়েরির যুদ্ধ” চিত্রকলাও তিনি সমাপ্ত করেন নি।তৎকালীন আলোচনাপত্র মারকুইস দে স্ত তে পিঁয়াত্র দ্যা নভেললরা লিখেছিলেন যে তুলি লিওনার্দোকে বিদায় দিয়েছে। স্থাপত্য,রচনা, গণিত, ভুতত্ত্ব, প্রযুক্তি বিদ্যা বা শারীর বিদ্যা, জল বিদ্যা, প্রণালী নির্মাণ বা মানুষের উড়ান নিয়ে গবেষণায় মেতে থাকা মানুষটিকে আর চিত্রকলা ভাবায় না এমন ধারণা প্রকট হয়ে উঠছিল। এসময় ‘লেদা’বা ‘সেন্ট জন ব্যাপটিস্ট’ ছবির পাশাপাশি তিনি উপহার দিলেন ‘লা জিওকোন্দা’ বা ‘লা জোকন্দ'( মোনালিসা ) চিত্রকলা। এনিয়ে বিতর্ক নেই যে, এই তিনটি চিত্র সমকালীন এবং ১৫০৫ থেকে ১৫১৫ সালের মধ্যে অঙ্কিত।অনেক বিশেষজ্ঞের মতেই মোনালিসা শিল্প কর্ম আঁকা শুরু হয় ১৫০৫ সালে। মোনালিসার ইতিহাস জানতে যার ওপরে প্রধানত নির্ভর করা হয় তিনি হলেন ভাসারি। তিনি লিখেছেন, ” ফ্রানসেস্কো দেল জিওকোন্দার জন্য তাঁর স্ত্রী মোনা লিসার প্রতিকৃতি শুরু করেন লিওনার্দো যা চার বছরের চেষ্টায় সমাপ্ত হয় নি এবং শেষ পর্যন্ত ফ্রান্সের রাজাকে এটি দিয়ে দেওয়া হয়। ” তোস্কানির দলিল থেকে জানা যায় ফ্রানসেস্কো ১৪৯৫ সালে তৃতীয় বার দ্বার পরিগ্রহ করেন ও বিয়ে করেন লিসা দি ঘেরারদিনিকে। ভাসারির লেখা থেকে জানা যায় ছবিটি আঁকার সময় ঘেরারদিনির বয়স ছিল ছাব্বিশ এবং তাঁকে নিয়ে আঁকা ছবিটি ইতালিতে “লা জিয়োকোন্দে’ আর ফ্রান্সে “লা জোকন্দ” নাম পরিচিত।
অনেকে বলেন মোনা লিসা বাস্তবের নারী নন এবং লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চির মানসকন্যা তথা কল্পনার ফসল। এরকম ও বলা হয়েছে এ কোনও নারীর ছবি নয়, দ্যা ভিঞ্চির নারী রুপী আত্মপ্রতিকৃতি। কেউ একে বলেছেন সেনোরা গুয়ালান্দা যিনি ছিলেন এক রক্ষিতা। অনেকেরই মতে দশ বছর ছবিটি নিয়ে কাটিয়েছেন লিওনার্দো। পাশাপাশি অনেকেই মনে করেন জুলিয়া দ্যা মেদিচির অনুরোধে ছবিটি আঁকা এবং মোনালিসার মডেল মেদিচির কোনও পছন্দের নারী। মোনালিসার ধাঁধা তবুও কিছুতেই মেটে না। লিওনার্দো তাঁর নোটবইতে যে মোনালিসা নিয়ে একদমই নীরব।

ভাসারি লিখে গিয়েছেন যে,লা জিয়োকোন্দে মোনালিসার স্মিতহাসি তুলে এনেছিলেন সঙ্গীতে তাঁকে আচ্ছন্ন রেখে। যাই হোক না কেন লিওনার্দোর সেরা ছবির সংজ্ঞা মেনে বলা যায় ছায়াছন্ন, কুয়াশাঘেরা বা মেঘলা দিনাবসানের ধারণা থেকে লা জিয়োকোন্দের সৃষ্টি। ছায়াবৃত, সন্ধ্যাগমণের আগে নারীর স্মিত হাসির নিদর্শন মোনালিসা। ভাসারি তাই বলেছেন, আঁখিপল্লব সত্যিকারের। মোনালিসা চিত্র খুব বেশিরকম প্রাণের প্রকাশ করে। যদিও কালের আখরে ও সঠিক সংরক্ষণ না হওয়ায় মোনালিসা ছবির ও ক্ষতি হয়েছে। তথাপি মোনালিসার সৌন্দর্য যেন অমলিন।রহস্যময় মোনালিসার ছবিতে ‘ভ্রূ‘ না থাকা সত্ত্বেও ছবিটির সৌন্দর্যে পড়ে নি কোন রকম প্রভাব । আজ এও মনে করা হয় যে,লিওনার্দো ভ্রু বানিয়েছিলেন, কিন্তু একাধিক পরিচর্যার জন্য তা মুছে যায়। ছবিটির আরেকটি বিশেষত্ব হলো চিত্রকলাটিকে দূর থেকে দেখলে মনে হয় মোনালিসা হাসছেন এবং কাছে আসলে দেখা যায় হাসি যেন আস্তে আস্তে মিলিয়ে যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন ছবিটি ৩০টি লেয়ার বিশিষ্ট, যা একেবারেই নিখুঁত । অতিপ্রাকৃত বিষয় নিয়ে গবেষণা করা ওয়েবসাইট প্যারানরমাল ক্রুসাইবেল জানাচ্ছে যে ছবিটিকে যখন আয়নার পাশাপাশি রাখা হয় তখন সেখানে একটি ভিনগ্রহের প্রাণী দেখা যায়। ফলে বিভ্রান্তি বেড়েই চলে।
ঘেরারদিনি বা বাঁন্দ্রানো অথবা গুয়ালান্দা অথবা স্বয়ং লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চি – সে যে মানুষই এই ছবির প্রাণ হয়ে থাকুন না কেন, রহস্যময় মোনালিসার সম্পর্কে চরম সত্য বলেছেন যেন অস্কার ওয়াইল্ড। ” তাঁর মুখমন্ডলটি যেন এক ক্ষেত্র – যেখানে পৃথিবীর যাবতীয় শেষ এসে মিশেছে – তাঁর আঁখিপল্লবও যেন ইষৎ নিদ্রাচ্ছন্ন “।।
( লেখক : পুরন্দর চক্রবর্তী, কন্টেন্ট রাইটার, সময় কলকাতা )


More Stories
বাংলা নববর্ষের ইতিহাস
আরেক অভিনেতা প্রণবের অকালপ্রয়াণ
বেজি কি সাপের বিষে কাবু হয় না?