Home » পরিবেশ বাঁচাতে চেয়ে জমি মাফিয়াদের রোষে প্রতিবাদী তরুণী

পরিবেশ বাঁচাতে চেয়ে জমি মাফিয়াদের রোষে প্রতিবাদী তরুণী

পুরন্দর চক্রবর্তী,সময় কলকাতা :

সবাই প্রতিবাদী হন না। কেউ কেউ হন প্রতিবাদী ।অন্যায়ের বিরুদ্ধে সবাই মনের জোর আর সাহসে ভর করে রুখে দাঁড়ান না। কেউ কেউ ব্যতিক্রমী।তাঁরা বৃহত্তর স্বার্থের কথা ভেবে ভয়ভীতি জয় করে আপনবলে দাঁড়িয়ে থাকেন সংঘবদ্ধ আসুরিক অপশক্তির বিরুদ্ধে।তন্দ্রা দাস এরকমই এক অনন্যা।পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও বিদ্যালয়কে বাঁচাতে উদ্যোগী হয়ে মাফিয়াদের প্রবল রোষে পড়েছেন তিনি।

তন্দ্রা দাস দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার ভাঙরের দক্ষিণ কাশীপুরের বাসিন্দা। তিনি এলাকার নজীরবিহীনভাবে মাফিয়ারাজের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন ।তিনি  পৈতৃক সাড়ে চোদ্দো বিঘার জমিতে বৃক্ষধ্বংস ও শিক্ষাস্থানে আঘাতের বিরুদ্ধে হয়েছেন সরব । হার না মানতে চাওয়ায় তাঁকে প্রাণে মারার হুমকি দিয়েছে জমি মাফিয়ারা। গাছ কাটা হয়েছে এবং বিদ্যালয় ভাঙচুর ও তছনছ করা হয়েছে। তাঁকে প্রকাশ্যে মারধর করা হয়েছে।তাঁর অভিযোগ, প্রতিবাদ করে বিপন্ন হলেও পুলিশ প্রশাসনের সহযোগিতা পান নি সে অর্থে। গাছ কাটার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ অথবা বিদ্যাপীঠ ভাঙচুর হওয়ার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়ে একাধিকবার আক্রান্ত হন তিনি।তন্দ্রা দাসের অভিযোগ,শাজাহান মোল্লা নামক জনৈক জমি মাফিয়ার নেতৃত্বে তাঁর ওপরে একটানা অত্যাচার চলছে। প্রকাশ্যে তাঁকে প্রহৃত হতে হয়েছে।তাঁকে রক্ষা করতে এসে নির্যাতিতা হয়েছেন তাঁর বৃদ্ধা মা।হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে তাঁকে।তবুও অন্যায়ের বিরুদ্ধে তন্দ্রা প্রতিরোধ জারী রেখেছেন তাঁর সীমিত ক্ষমতাবলে।থেমে নেই তন্দ্রা।

তন্দ্রা দাস চেয়েছেন শিক্ষার আলো ছড়িয়ে পড়ুক সমাজের সর্বস্তরে।যে স্বপ্ন দেখেছিলেন সেই স্বপ্নের বীজ বুনে দিতে চেয়েছেন খুদে, কচিকাঁচাদের মধ্যে। নিজের উদ্যোগে দুটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার শপথ নিয়েছিলেন।পাঁচ ভাই-বোনের যৌথ জমিতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চলছিল বেশ সাবলীল ভাবে। এসময় তাঁদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান লাগোয়া তাঁদের পরিবারের স্থাবর ভূসম্পত্তির দিকে নজর পড়ে জমি মাফিয়াদের। আর এই বিষয়সম্পত্তির মধ্যে ছিল আমগাছ সহ বহু ফলন্ত বৃক্ষ। তন্দ্রা দাসের অভিযোগ, জমি হাতিয়ে নিতে প্রথমে তাঁর বাবার এবং পরে পরিবারের অন্য সদস্যদের সই জাল বা ক্ষেত্রবিশেষে ভীতি ও প্রলোভন দেখানো শুরু হয়। রুখে দাঁড়ান তন্দ্রা। একদিকে আইনের দ্বারস্থ হয়ে আইনি প্রক্রিয়া জারী রেখে তিনি তাঁর প্রতিষ্ঠান চালাতে থাকেন। তন্দ্রার অনমনীয় মনোভাব দেখে অন্য রাস্তা নেয় জমি মাফিয়ারা। জমির প্রাণ বৃক্ষগুলিকে ধ্বংস করার খেলায় মাতে দুষ্কৃতীরা।

পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হতেই সরাসরি প্রতিবাদের রাস্তায় হাঁটেন তন্দ্রা। আদালতের বিচার্য ও ইনজাংশান জারী থাকায় জমিতে শাজাহান মোল্লার অবৈধ হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান।আইনি বিধিনিষেধের কথা বলে তিনি হয়ে ওঠেন টার্গেট ।দুহাজার একুশ সালের একটি ভাইরাল ভিডিও ফুটেজে ( যার সত্যতা সময় কলকাতা যাচাই করে নি )শাজাহান মোল্লাকে প্রাণনাশের হুমকি দিতে দেখা যায় । দেখা যায়,তিনি তন্দ্রাকে গুলি করে মারার হুমকি দিচ্ছেন।

তন্দ্রার অভিযোগ, জীবন বিপন্ন হওয়া সত্ত্বেও পুলিশ প্রশাসনের সহযোগিতা পান নি তিনি। এর মধ্যে একাধিকবার তার ওপরে কার্যত প্রাণঘাতী হামলা হয়েছে। ভাঙচুর হয়েছে স্কুল।তন্দ্রার “অপরাধ” যে তিনি জমি মাফিয়াদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে স্কুল চালাতে চেয়েছেন আর পরিবেশ বাঁচাতে চেয়েছেন। অবশেষে চরম আক্রমণ নেমে আসে বাইশ সালের এপ্রিল মাসে।অভিযোগ,মাঠের মধ্যে ফেলে তাঁকে ও তার বৃদ্ধা মাকে নৃশংস ভাবে মারধর করে দুষ্কৃতীরা।কেড়ে নেওয়া হয় মোবাইল।তাঁদের চোখে মুখে বিষাক্ত রাসায়নিক ছিটিয়ে দেওয়া হয়। লাঠি ও বাঁশ দিয়ে বেধড়ক প্রহার করা হয় তাঁদের। মাঠের মধ্যে কার্যত সংজ্ঞাহীন হয়েছিলেন মা ও মেয়ে । কেউ তাঁদের বাঁচাতে আসে নি মাফিয়াদের ভয়ে।

যে মাটিতে পড়েছিলেন তন্দ্রা, সেই মাটি ধরেই উঠে দাঁড়িয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পাশাপাশি প্রশাসনের প্রতিটি দরজার কড়া নাড়তে শুরু করেন তন্দ্রা। হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে আবার বিদ্যা প্রতিষ্ঠানকে গুছিয়ে নিয়ে পড়াতে শুরু করেছেন তিনি। জীবনকে হাতের মুঠোয় তুলে নিয়েছেন, ভয় শুধু পড়ুয়াদের কথা ভেবে।তাদেরকেও ভীতিপ্রদর্শন করা হচ্ছে । তথাপি যেকোনো মূল্যে পরিবেশকে বাঁচাতে চাইছেন তন্দ্রা। পরিবার ও কন্যা নিয়ে তাঁর ভরা সংসারের মধ্যেও তাঁকে ঘিরে রাখছে মাফিয়াদের আগুনচোখ। দক্ষিণ কাশীপুরের পাল পাড়ার তন্দ্রা বলেছেন তিনি অন্যায়ের কাছে মাথা নত করবেন না। পুলিশ প্রশাসনের সহযোগিতা না পেয়ে জীবনকে বাজি রাখছেন তিনি।তিনি মনে করেন যে সত্যের পথ অনুসরণ করেছেন তাই যাবতীয় বাধা সামলে জয় তাঁর হবেই ।হার মানতে নারাজ প্রতিবাদী তরুণী।অন্যায়ের বিরুদ্ধে অতন্দ্র প্রহরী হয়ে শিক্ষাস্থান ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে চলেছেন অনন্যা তন্দ্রা।।

About Post Author