Home » আজও সত্যজিত রায়ের উত্তরসূরি নেই বাংলা সিনেমায়?

আজও সত্যজিত রায়ের উত্তরসূরি নেই বাংলা সিনেমায়?

সময় কলকাতা ডেস্ক: সত্যজিৎ রায়ের  চিত্রভাবনাকে ডিঙিয়ে যাওয়ার কোনও দীর্ঘ চেহারার মানুষ এখনও চোখে পড়ছে না। শুধু চিত্র ভাবনা বলছি কেন, তাঁর মতো গভীর সমাজ সচেতনতা, দলীয় রাজনীতির বাইরে দাঁড়িয়ে সোচ্চার এত স্পষ্ট ভাবে রাজনীতির উচ্চারণ, জীবনকে নানা দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার অনুকরণীয় ভঙ্গি, এখন আর দেখছি কোথায়! তাই ১৯৫৫ সালের ২৬ আগস্ট যদি বাংলা সিনেমার নবজন্মের দিন হয়, তাহলে ১৯২০ সালের ২ মে তারিখটা হচ্ছে সেই নবজন্মদাতার জন্মদিন! বাংলা সিনেমা যাঁর হাত ধরে এখনও পর্যন্ত এগিয়ে চলেছে।

আজকের অনেকেই হয়তো বলবেন, পুরনো কাসুন্দি ঘেঁটেই আপনারা প্রবীণরা আনন্দ পান। নতুনদের মধ্যে কোনও প্রতিভা দেখতে পান না! ছবির কারিগরি কৌশল বদলে যাচ্ছে, সমাজের কাঠামো ভেতর থেকে ঘুন ধরে গেছে, রাজনৈতিক দেউলিয়াপনা এখন জীবনকে বিষময় করে তুলছে, এই কঠিন সময়ে আবার একজন সত্যজিৎকে কি সত্যিই দরকার? হ্যাঁ, দরকার, শিরদাঁড়া সোজা রেখে বজ্রগম্ভীর স্বরে যিনি সাদাকে সাদা, কালোকে কালো বলার হিম্মত রাখবেন। কই, এখন এমন একজনও কি কলকাতার ফিল্ম মহলে আছেন, যিনি আজকের অসহনীয় সত্যটাকে সেলুলয়েডে তুলে আনতে পারেন? নেই, দুর্ভাগ্য আমাদের। তাই সত্যজিৎ রায়ের জন্মশতবার্ষিকীতে দাঁড়িয়ে গভীর হতাশার স্বরে বলতে হচ্ছে – সত্যজিৎ তাঁর কোনও যোগ্য উত্তরাধিকার রেখে যেতে পারলেন না।

দায়টা তাঁর নয়, আমাদের। শুরু হয়েছিল বাংলা সাহিত্যের এক ক্লাসিক রচনা বিভূতিভূষণের ‘পথের পাঁচালী’  দিয়ে। ছবিটি শুধু বাংলা সিনেমার প্রকৃতি, চরিত্র, চেহারাই বদলে দেয়নি, বিশ্ব সিনেমার চিরকালীন ক্লাসিক হয়ে আছে এখনও। তাঁর নাতি দীর্ঘ ফিল্মজীবন ছিল সাফল্যের ফলেফুলে ভরা। জীবনের শেষ ছবি ‘আগন্তুক’ তিনি বানিয়েছিলেন শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে। কিন্তু তাঁর সেই শেষ সৃষ্টিও ছিল অন্যতম সেরা কাজ। জীবন সায়াহ্নে তিনি তাঁর সারা জীবনের অভিজ্ঞতালব্ধ চেতনা, বোধ ও শিক্ষা দিয়ে আজকের তথাকথিত শিক্ষিত বাঙালির অহংবোধে চপেটাঘাত করে গিয়েছেন।

 

একজন সামাজিক দায়বদ্ধ পরিচালকের কাজই দর্শকদের সচেতন করা। তিনি ফিল্ম নিয়ে বিপ্লব বা ‘সমাজ কো বদল ডালো’র কাজে তো আর নামেননি। তাছাড়া সত্যি বলতে কী সিনেমা কবে কোন দেশে সমাজকে বদলে দিতে পেরেছে, বিপ্লব এনে দিয়েছে? ছবি যেটা পারে তা হল জনসাধারণকে সচেতন করে তোলা, পরিবর্তনে উদ্বুদ্ধ করা। সত্যজিৎ আমৃত্যু সেই কাজটি নিজের বিশ্বাস, নিজের সাধ্যমতো করেছেন। শুধু সিনেমা নয়, তাঁর লেখা কিশোর সাহিত্য ‘ফেলুদা’ সিরিজ বা প্রফেসর শঙ্কুর কাহিনি আজও বেস্ট সেলার। তাঁরই তৈরি দু’টি মিউজিক্যাল ছবি ‘গুগা বাবা’, ‘হীরক রাজার দেশে’ এখনও বাংলা সিনেমায় দু’টি হীরক খন্ড বিশেষ।

বাংলা সংস্কৃতি জগতে রবীন্দ্রনাথের পর এমন বহুমুখী প্রতিভার দেখা আমরা এখনও পাইনি। ফিল্ম বানানো তো বটেই, কলমে, তুলিতেও তিনি অনবদ্য শিল্পের সম্ভার রেখে গিয়েছেন। খুদে পাঠকদের কাছে তিনি এখনও প্রিয়তম লেখক। ক্যালিগ্রাফি নিয়েও তাঁর অন্বেষণের অন্ত ছিল না। তিনি ‘রে ফন্ট’ তৈরিও করেছিলেন। কিন্তু ফিনিশিং টাচটুকু আর দেবার সময় পাননি। অকালে ই চলে গেলেন। আজ জন্মশত বর্ষের সামনে দাঁড়িয়ে তাঁকে বিনম্র প্রণাম জানানো ছাড়া আর কীই বা করতে পারি আমরা! কারণ, আমরা এখন মেরুদণ্ড হারিয়েছি। বিশ্বাস, বোধ জলাঞ্জলি দিয়েছি। জীবনকে এখন ভুবনায়নের নিক্তিতে ওজন করি। পার্থিব লাভ-ক্ষতি ছাড়া অন্য কোনও উদ্দেশ্যই নেই আমাদের।

 

About Post Author