সময় কলকাতা ডেস্ক : চারু মজুমদার নামটি উচ্চারণ হলেই এককথায় নকশালবাড়ি কৃষক আন্দোলনের কথা ফুটে উঠবে।তিনি ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী) এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা।দলের সহকর্মী তথা কমরেডদের কাছে ” সি এম” নামেই খ্যাত ছিলেন চারু মজুমদার। তাঁর গড়ে তোলা আন্দোলন ও তার সাফল্য বা অভিমুখ নিয়ে রয়েছে বিতর্ক।
চারু মজুমদার (সি এমের) জন্ম বারাণসীতে ১৯১৯ সালে। মে মাসের ১৫ তারিখে তিনি জন্মেছিলেন বলেই ধরা হয়। তিনি বেঁচেছিলেন ৫৩ বছর। অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন চারু মজুমদার।শৈশবে তাঁকে শিলিগুড়ি নিয়ে আসা হয়।ইংরেজ ভারতে যৌবনে তিনি বিভিন্ন আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। তিনি ১৯৩৮ সালে কৃষকদের হয়ে সংগ্রাম শুরু করেন। ১৯৩৯-এ সংলগ্ন জলপাইগুড়ি জেলায় যখন সিপিআই-এর একটি ইউনিট প্রতিষ্ঠিত হয়, যুবক চারু সত্বর সেখানে যোগদান করেন এবং দ্রুত সর্বক্ষণের কর্মী হয়ে ওঠেন। চরমভাবে শোষিত কৃষক জনগণের মধ্যে তিনি কাজ শুরু করেন। জেলার কৃষি-অর্থনীতির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ ছিল আধিয়ার প্রথা (যে ব্যবস্থায় ভাগচাষিরা ফসলের অর্ধেক ভাগ পেতেন)। আধিয়ারদের ফসলের সিংহভাগই জমিদাররা গ্রাস করে নিত। আর এভাবেই তাদের ঐ জমিদারদের কাছ থেকেই অত্যন্ত চড়া সুদে ঋণ গ্রহণ করতে বাধ্য করা হত। ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষের সময় তাঁর প্রস্তাব অনুসারেই আধিয়ারদের জঙ্গী আন্দোলন সংগঠিত হয়। জমিদাররা তাদের শস্যের গোলা পাহারা দিয়ে রাখায় আধিয়ারদের অনাহারে মরতে হচ্ছিল। পার্টি শ্লোগান তুলল – আমরা গুলি খেয়ে মরব তবু না খেয়ে মরব না।

১৯৪৮ সালে তিন বছর কারাবাস হয় তাঁর । জীবনের শেষ দিকে তিনি পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন স্বাধীনতাপরবর্তী বঙ্গের অন্যতম প্রভাবশালী ও জঙ্গী নেতা রূপে । কানু সান্যাল, জঙ্গল সাঁওতাল, সুশীতল রায়চৌধুরী প্রমুখের সহযোগিতায় চারু মজুমদার কমিউনিস্ট কনসোলিডেশন গঠন করেন। কলকাতা ময়দানে এক জনসভায় কানু সান্যাল সিপিআই (এমএল) গঠনের কথা ঘোষণা করেন । চারু মজুমদার(সি এম )ছিলেন এদলের নেতৃত্বে। তার পরিচালিত আন্দোলন নকশালপন্থী আন্দোলন নামেই তখন সাধারণভাবে পরিচিতি লাভ করে। নকশালবাড়ির সশস্ত্র কৃষক বিদ্রোহের উদ্দেশ্য ছিল প্রকৃত কৃষকদের জমির মালিকানা লাভ যা থেকে এই আন্দোলনের উৎপত্তি। ১৯৬৯-৭১ খ্রিস্টাব্দের ২ বছর এই নবগঠিত দল সমগ্র বাংলায় এক সুসংহত জঙ্গী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
সি এম (চারু মজুমদার) নকশালবাড়ি বিদ্রোহের ঐতিহাসিক বিবরণ এবং তাঁর লেখাগুলি রচনা করেছিলেন – বিশেষ করে ঐতিহাসিক আটটি দলিলগুলি সেই আদর্শের অংশ হয়ে উঠেছে যা আন্দোলনকে পরিচালনা করে।ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী) দলটির প্রথম সাধারণ সম্পাদক পদে নিযুক্ত সি এম যে নকশালবাড়ি আন্দোলনের প্রধান মুখ ছিলেন তাই নয়, তাঁর মৃত্যুর আগে দলে যে ভাঙ্গন শুরু হয় তা তাঁর মৃত্যুর পরে কার্যত পরিষ্কার হয়ে ওঠে । আর এখানেই উঠে আসে সি এম ও তাঁর পথ নিয়ে বিতর্ক।
প্রদীপ বসুর মত রূঢ় সমালোচক লিখেছেন, “মজুমদারের নেতৃত্ব তাঁর তত্ত্বগত শ্রেষ্ঠত্ব, মতাদর্শগত পরিপক্কতা অথবা অন্যদের চেয়ে তাঁর আগে চিন্তা করার সামর্থ্যের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠেনি। বিপরীতে, তাঁর নেতৃত্ব ছিল অ্যাকশন নির্ভর। নকশালবাড়ির অভ্যুত্থানের পর ‘মতাদর্শবিহীন, তাত্ত্বিকতাহীন, অভিজ্ঞতাবাদের’ ভিত্তিতে তাঁদের মধ্যে ঐক্য গড়ে উঠলেও “গোড়া থেকেই নকশালপন্থীদের মধ্যে তত্ত্বের প্রশ্নে মতপার্থক্য ছিল” আর সেটাই “তাঁদের বিভিন্ন গোষ্ঠীতে বিভক্ত হয়ে যাওয়ার কারণ।”

আন্দোলনের অভিমুখ নিয়ে এও বলা হয় ‘নকশালবাড়ি আন্দোলনের ব্যর্থতা ছিল অবধারিত কেননা তা মতাদর্শগতভাবে যথেষ্ট প্রস্তুতি ছাড়াই গড়ে উঠেছিল এমন একজনের নেতৃত্বে যিনি অ্যাকশনপন্থী হিসেবে মহৎ হলেও তাত্ত্বিক দিক থেকে ছিলেন (বিতর্কপন্থীদের থেকে) নিকৃষ্টতর।”
‘সি এমে’র সমর্থনে পাল্টা মত ছিল এই মত গ্রহণযোগ্য নয়।”প্রথমত, সি এম-এর নেতৃত্ব নিছক নকশালবাড়ির অভ্যুত্থানের ওপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছিল – যদিও পাল্টা মত হিসেবে বলা হয় ‘এমন সিদ্ধান্ত টানাটা একেবারেই হাস্যকর। এভাবে দেখলে তো সে নেতৃত্ব ১৯৬৭-র আগস্টের পর আর স্থায়ীত্বই পেত না – কারণ নকশালবাড়ির অভ্যুত্থান তার আগেই স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। ”
সিএম অনুসারী মতের সমর্থক অরিন্দম সেন প্রমুখ লিখেছেন, ” লেনিন দেখিয়েছেন, ১৯১৭ ও তার পরবর্তীকালে রাশিয়া ঠিক এমনই এক অসাধারণ সময়ের মধ্য দিয়ে চলেছিল যখন বিপ্লবী মার্কসবাদীরা নেহাৎ পাঠ্য বইয়ের মধ্যে মুখ গুঁজে থাকতে পারেননি। তিনি বলেছিলেন, তাদের অবশ্যই সৃজনশীলভাবে মার্কসবাদকে প্রয়োগ করার হিম্মত দেখাতে হবে এবং নেপোলিয়নের মতো সক্রিয়তা দেখাতে হবে, যিনি বলেছিলেন : “প্রথমে নিদারুণ এক সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড় আর তার পর দেখ কী ঘটছে।”
চারু মজুমদার নির্দেশিত পথের সমর্থকরা বলেন, ভারতে সি এম-ই হলেন প্রথম সর্বাগ্রগণ্য ব্যক্তি যিনি মার্কসবাদের এই “বিপ্লবী দ্বান্দ্বিকতাকে” আয়ত্ত করেছিলেন এবং বলশেভিক স্পিরিটকে আত্মস্থ করেছিলেন।
উল্লেখ্য,চারু মজুমদারের নেতৃত্বে আন্দোলনের প্রভাব বিহার, অন্ধ্রপ্রদেশ প্রভৃতি অন্যান্য রাজ্যে ছড়িয়ে পড়ে। শোষণহীন সাম্যবাদী সমাজ ব্যবস্থা কায়েমের আশায় অনেক প্রতিভাবান যুবক ও যুবতী তার এই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে। মাও সে তুং এর রেড বুক অবলম্বনে বেশ কিছু স্লোগান চারু মজুমদার বাংলায় জনপ্রিয় করেন। যথা ‘চিনের চেয়ারম্যান আমাদের চেয়ারম্যান’, ‘বন্দুকের নলই শক্তির উৎস’, ‘শ্রেণি শত্রুকে হত্যাই একমাত্র সশস্ত্র বিপ্লবের পথ’ ইত্যাদি।
ভারত সরকার কর্তৃক নকশালদের কার্যকলাপের বিরুদ্ধে কঠোর দমননীতি প্রয়োগ করা হয়। ভারত সরকার কর্তৃক তার বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ড পরিচালনা ও সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার অভিযোগ আনে।অতঃপর চারু মজুমদারের উপর গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়। তিনি কিছুদিন পালিয়ে থাকলেও ১৯৭২-এর ১৬ জুলাই কলকাতার এন্টালী রোডের এক বাড়ি থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। ২৮ জুলাই পুলিশ লক আপে হৃদরোগে তার মৃত্যু হয়েছে বলে ভারত সরকার কর্তৃক ঘোষণা করা হলেও নকশালপন্থীরা এই মৃত্যুকে স্বাভাবিক বলে আজও মানতে নারাজ।।


More Stories
কেন ফুল বদলালেন লিয়েন্ডার পেজ?
বোমা-বন্দুক আনব, তৃণমূল নেতাদের গণপিটুনির হুঙ্কার দিলীপ ঘোষের
জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণ কতটা সম্ভবপর?