সময় কলকাতা ডেস্ক : কুয়াশায় ঢাকা ভোরে ধনঞ্জয়রা আসে , আবার সহসা তারা মিলিয়ে যায়। তাদের ঐক্যবদ্ধ সমাজ গঠনের ভাবনা সফল হলেই তারা পাড়ি দেয় অন্য কোথাও। যেখানে স্বপ্ন দেখতে মানুষ ভুলে যায় সেখানে তাদের চোখে মায়ার কাজল বুলিয়ে দেয়।তাদের টুকরো টুকরো গল্পগুলি জোড়া লাগিয়ে সত্যি করে আবার যাত্রা ধনঞ্জয়দের।তাদের পথ চলার শুরু নেই, শেষও নেই।

ষাটের দশকের খাদ্য আন্দোলনের চেহারা যখন স্পষ্ট তখন ১৯৬৬ সালে তপন সিংহ উপহার দিলেন এক আশ্চর্য ছবি ‘গল্প হলেও সত্যি’।চালের অভাবে ভাতপ্ৰিয় বাঙালি আমেরিকার সাহায্যে আসা গমের সৌজন্যে একবেলা রুটি খেয়ে বাঁচছে। সমস্যা নিত্যসঙ্গী। বিশ্বাস ভাঙছে। সমস্যায় জেরবার একান্নবর্তী পরিবারগুলি ভেঙে খান খান হয়ে যাওয়ার জোগাড়। এরকম সন্ধিক্ষণে ধনঞ্জয়ের আগমন। তপন সিংহ পরিচালিত মীরা সরকার প্রযোজিত “গল্প হলেও সত্যি” ছবিতে বাস্তবের প্রেক্ষাপটকে অন্যভাবেই তুলে ধরা হয়েছিল। এখানে গল্পের ছলে বলা হয়েছে কার্যত সম্ভাবনাময় এক বিপ্লবের কথা । ফেলিনির ছবির মত ব্যাকগ্রাউন্ড গানকে ব্যাকডেটেড করার মত কিছু ইঙ্গিতের মধ্যে বার্তা অনৈক্যর মধ্যে থাকা সম্ভাবনাময় সংসারের পতন রুখে দেওয়া। স্বপ্ন রচনা ঐক্যবদ্ধ বন্ধনের।

“ একান্নবর্তী পরিবারে ভাঙন” শব্দটা তখন সাধারণ বিষয় হয়ে উঠেছিল মেথরের অভাবে কলতলার শ্যাওলা জমা কিংবা রন্ধনকার্যে অনীহায় পরিবারের স্ত্রীয়েরা । গৃহকর্মে নিপুনা মায়েরা যেন সংসারের সমস্যায় জর্জরিত। তারাও যেন হাপিয়ে উঠেছেন । একান্নবর্তী পরিবারে ঠোকাঠুকি যেন রাতদিনের সঙ্গী। সেই রেশ যেন গিয়ে পড়েছে পরিবারের কর্তা ব্যাক্তিদের গায়ে। তাদের কর্মজগতেও গিয়ে পড়েছে সেই প্রভাব।কাজের লোক ডুব মেরেছে ফলে সংসার জুড়ে টালমাটাল পরিস্থিতি । এমন পরিস্থিতিতেই ধনঞ্জয়ের আগমণ। ভাইদের পরস্পরকে অবিশ্বাস আর বাড়ির বৌদের স্বার্থপ্রবণতা তখন চরমে। ধনঞ্জয়ের বক্তব্য ছিল, যাঁর যেখানে কাজ সেখানেই তাঁর মুক্তি। ছবির শেষে তাই অন্তর্হিত হয় ভাতৃদ্বন্দ্ব। অদৃশ্য হয়ে যায় স্বার্থের সংঘাত। শহর কলকাতা, গড়ে উঠতে থাকা শহরতলী আর বাঙালির অন্দরমহলে অবিশ্বাস থেকে মুক্তির বিপ্লব নিয়ে আসে ‘গল্প হলেও সত্যি’। স্বপ্ন দেখার গল্প যা প্রবল সত্যি।
প্রবল সত্যি বাড়ির ছেলে পিন্টুর গলায় প্রভাতীর কথা: “এ জীবন গেলে ফিরে আসে না আবার”। কর্মে মুক্তির আপ্তবাক্য উচ্চারণ করা ধনঞ্জয়ের মধ্যে দিয়ে এমনই কিছু অমোঘ বার্তা দর্শকদের কে দিয়েছিলেন পরিচালক। বাড়ির সামান্য চাকর এখানে রূপক হয়ে সময়ের গুরুত্ব শেখায়, পরিবারে ভাঙন রোধ করতে শেখায়, জীবনে উদ্যম হারিয়ে গেলে তাও ফিরিয়ে আনতে শেখায়। এভাবেই তপন সিংহ ধনঞ্জয়ের চরিত্রে রবি ঘোষকে সফল ভাবে ব্যবহার করে বাঙালী দর্শকদের দিলেন পরিবারের ভাঙন থেকে উত্তরণের পথ।আর দিলেন মায়ার কাজল।
ছবিতে উঠে এসেছে হালদার বাড়ির মননশীলতায় স্বতন্ত্র হতে চাওয়া খোকার গলায় ফেলিনির কথা।খোকা যেন কলকাতার ষাটের দশকের পাল্টে ফেলার ভাবনার শরিক। তাঁর উল্লিখিত চিত্র পরিচালক ফেদেরিকো ফেলিনির ছবিতে ব্যাকগ্রাউন্ড গানকে ছুঁড়ে ফেলার কথা উচ্চারিত হয়েছে। কেন ফেলিনির কথা বাংলায় তুলে আনলেন তপন সিংহ? ‘লা দোলচে ভিটা’র পরিচালক ফেলিনির মতই কি তপন সিংহ মনে করেছেন বাস্তবের ঝিনুকের মধ্যে বেড়ে ওঠা মুক্তো যেমন ঝিনুকটির জীবনকাহিনি বিধৃত করে, সিনেমাও তা-ই? তপন সিংহ ও কি মনে করেছেন সে-ও পরিচালকের জীবনস্মৃতি, অন্তর্নিহিত অভিজ্ঞতার স্মৃতি বহন করে? হয়তো তাই।
সিনেমা শুধু বিনোদনই নয় তার মধ্যে রয়েছে জীবনে চলার পাথেয়। আর সেই পাঠ উপহার দেয় ‘গল্প হলেও সত্যি’। গল্পের স্বপ্নকে সত্যি করার মহড়ার নাম ‘গল্প হলেও সত্যি ‘। আর তাই ধনঞ্জয় আসে, ঐক্যের ছবি এঁকে চলে যায়। থেকে যান তপন সিংহ। অসামান্য বাংলা ছবি ‘ গল্প হলেও সত্যি ‘ ফেলিনির নাম উল্লেখ করে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েই হয়তো থেকে যায় কালের আখরে অক্ষয় হয়ে। ফেলিনি তো মনে করতেন,’শেষ বলে কিছু নেই, কোনও কিছুর শুরু নেই।’ ধনঞ্জয়ের স্বপ্নও তেমন করেই যেন অনাদি-অনন্ত।।


More Stories
মহানায়ক উত্তম কুমার : জন্মদিনের চেয়ে মৃত্যুর দিনটি মানুষ মনে রেখেছেন, কিন্তু কেন?
বউ বদল : ময়নাগুড়িতে স্বামী-স্ত্রীর বদলাবদলি নাকি বদলা ?
অন্নপূর্ণার লক্ষ্মীরা আসছে