Home » বিপ্লবী সাংবাদিক কাজী নজরুল

বিপ্লবী সাংবাদিক কাজী নজরুল

পুরন্দর চক্রবর্তী, সময় কলকাতা :

আমাদের চেতনাতে নজরুল আছেন প্রবলভাবে । বিদ্রোহী কবি হয়ে আছেন, প্রেম ও বিরহের কবি হয়ে আছেন। পাশাপাশি নজরুল ইসলাম যে বিপ্লবী সাংবাদিকও ছিলেন সেকথাও চেতনা থেকে সরে যাওয়ার কথা নয়।

নজরুলের ১২৩ তম জন্মদিনে উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরে বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে বিদ্রোহী কবিকে নিয়ে আয়োজন করা হল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের। কবিতা ও গানের মধ্যে দিয়ে স্মরণ করা হ’ল কবিকে। তথ্য সংস্কৃতি দপ্তরে উপস্থিত ছিলেন কৃতী মানুষ। কবিকে নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে চলল অনুষ্ঠান। ছিলেন জেলার বহু সাংবাদিক। সাংবাদিক ঠাসা অনুষ্ঠান যেন স্মরণ করিয়ে দিল বিদ্রোহী কবির সাংবাদিক সত্ত্বাও। জীবনের অজস্র অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ কাজী নজরুল ইসলাম যে সাংবাদিক ছিলেন সেকথা তো ভুলে যাওয়ার নয়।

বিদ্রোহী কবির জীবন ছিল ঘটনাবহুল।১৯১৭ সালে সৈনিক জীবন যাপন করেন। আড়াই বছর তিনি ছিলেন সেনাবাহিনীতে। ১৯২০ সালে কলকাতায় এসে নজরুল ৩২ নং কলেজ স্ট্রিটে বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সমিতির কার্যালয়ে থাকতে শুরু করেন। থাকতেন সমিতির অন্যতম কর্মকর্তা মুজফ্‌ফর আহমদ। এখান থেকেই সূচনা সাহিত্য-সাংবাদিকতা জীবনের। প্রথম দিকেই মোসলেম ভারত, বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা, উপাসনা প্রভৃতি পত্রিকায় তার কিছু লেখা প্রকাশিত হয়।

১৯২০ সালে নবযুগ নামক একটি সান্ধ্য দৈনিকে নজরুল নিয়মিত ও প্রত্যক্ষভাবে  সাংবাদিকতার শুরু করেন।অসহযোগ ও খিলাফত আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে প্রকাশিত এই পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন শেরে-বাংলা এ.কে. ফজলুল হক। এই বছর তিনি “মুহাজিরীন হত্যার জন্য দায়ী কে” শিরোনামে একটি প্রবন্ধ যার জন্য পত্রিকার জামানত বাজেয়াপ্ত করা হয় এবং নজরুলের উপর পুলিশের নজরদারী শুরু হয়। সাংবাদিকতার মাধ্যমে তিনি তৎকালীন রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থা প্রত্যক্ষ করার সুযোগ পান। একইসাথে মুজফ্‌ফর আহমদের সাথে বিভিন্ন রাজনৈতিক সভা-সমিতিতে যোগদানের মাধ্যমে রাজনীতি বিষয়ে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পেয়েছিলেন।

নজরুল  ১৯২২ সালে ধূমকেতু পত্রিকা প্রকাশ করেন যা তাঁর সাংবাদিকতা জীবনের এক স্বতন্ত্র অভিমুখ গড়ে দেয় । পত্রিকাটি সপ্তাহে দুবার প্রকাশিত হত।পত্রিকার প্রথম পাতার ওপরের দিকে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাণী থাকত। পত্রিকার ১৯২২ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর সংখ্যায় নজরুলের কবিতা ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ প্রকাশিত হয়। কবিতাটি রাজনৈতিক কবিতা হিসেবে রাষ্ট্রদ্রোহ মূলক মনে হওয়ায় ব্রিটিশ সরকারের রোষানলে পড়েন নজরুল। পত্রিকার সংখ্যাটি নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়। একই বছরের ২৩ নভেম্বর তার যুগবাণী প্রবন্ধগ্রন্থ বাজেয়াপ্ত করা হয় এবং একই দিনে তাকে কুমিল্লা থেকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারের পর তাকে কুমিল্লা থেকে কলকাতায় নিয়ে আসা হয়। ১৯২৩ খ্রিষ্টাব্দের ৭ জানুয়ারি নজরুল বিচারাধীন বন্দী হিসেবে আত্মপক্ষ সমর্থন করে এক জবানবন্দি প্রদান করেন। চিফ প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট সুইনহোর আদালতে এই জবানবন্দি দিয়েছিলেন।  এই জবানবন্দি বাংলা সাহিত্যে রাজবন্দীর জবানবন্দী নামে পেয়েছে সাহিত্যিক মর্যাদা।

বিচারের পর নজরুলকে এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। আলিপুর জেলে বসে তিনি লেখেন তাঁর অমর লেখনী ‘ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে’। তাঁর সৃষ্টি সুখ পাঠকের পাঠসুখ হয়ে থেকেছে শতাধিক বছর ধরে। সাংবাদিক হিসেবে নজরুলের কারাবাসের শতবর্ষ পূর্ণ হচ্ছে এবছরই। আর হয়তো এখানেই তথ্য ও সংস্কৃতি বিভাগের কবির অনুষ্ঠানের জন্মদিন অনুষ্ঠান পালনের স্বাতন্ত্র।।

About Post Author