Home » নীলগঞ্জ এক রক্তাক্ত ইতিহাসের নাম

নীলগঞ্জ এক রক্তাক্ত ইতিহাসের নাম

বিশ্বজিৎ হীরা,সময় কলকাতা:১৯৪৫ সালের ২৫শে সেপ্টেম্বর , নীলগঞ্জের আজাদ হিন্দ বাহিনীর বন্দিদের ডিটেনশন ক্যাম্পে আচমকাই শুরু হয় বন্দি বিক্ষোভ। আজাদ হিন্দ বাহিনীর বন্দি কিছু সৈনিক বিদ্রোহ ঘোষণা করে ব্রিটিশ সেনাদের কাছ থেকে অস্ত্র ছিনতাই করার চেষ্টা করে, শুরু হয় এক অসম লড়াই। ব্রিটিশ সেনার গুলিতে একের পর এক বন্দি লুটিয়ে পড়তে থাকে মাটিতে। কিছু বন্দি কাঁটাতারের বেড়া পার হয়ে পালানোর চেষ্টা করলে, ব্রিটিশ সেনাদের গুলিতে কাঁটা তারের উপরেই লুটিয়ে পড়ে। সন্ধ্যা থেকেই লাগাতার গুলির শব্দ ভেসে আসতে থাকে ডিটেনশন ক্যাম্প থেকে। তৎকালীন সময় ডিটেনশন ক্যাম্পের পাশে বসবাসকারী কিছু মানুষ ভয়ে সিঁটিয়ে ঘরের ভিতরে লুকিয়ে পরে। সারা রাত ডিটেনশন ক্যাম্পে চলে গুলি আর বন্দিদের আর্তনাদ। সকালের সূর্যের প্রথম কিরণ বন্দীদের লাল রক্তে প্রতিফলিত হয়ে লাল আভায় পরিণত হয়। তৎকালীন সময়ের দুই প্রত্যক্ষদর্শী সত্য বাগ এবং গোপাল সাঁধুখা জানিয়েছিলেন সকালবেলায় তারা দেখেছিলেন গাড়ি ভর্তি করে আজাদ হিন্দ বাহিনীর সৈন্যদের মৃতদেহ নিয়ে যাওয়া হয়েছিল গঙ্গায় ফেলার উদ্দেশ্যে, রক্তের লাল হয়ে গিয়েছিল ডিটেনশন ক্যাম্প সংলগ্ন রাস্তা। বহু সৈনিককে পুঁতে দেওয়া হয়েছিল ডিটেনশন ক্যাম্পের পাশের খালের পাড়ে। যেখানে আজ সাতটা তালগাছ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে। আজও বহু মানুষ বলে ওই সাত তালতলায় আজও আজাদ হিন্দ বাহিনীর সৈন্যদের অতৃপ্ত আত্মা ঘুরে বেড়ায়। অতৃপ্ত আত্মাদের কথা জনশ্রুতি হলেও আজও ওখানকার মাটি খুঁড়লে মৃত সৈনিকদের কঙ্কালের অবশিষ্টাংশ পাওয়া যায়।

ছবি :অজয় মণ্ডল

কেন হয়েছিল বিদ্রোহ?

১৯৪৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম থেকেই নীলগঞ্জের ব্রিটিশদের ডিটেনশন ক্যাম্পে শুরু হয়েছিল বন্দী আজাদ হিন্দ বাহিনীর সৈনিকদের বিক্ষোভ। মূলত তিন- চারটি কারণের জন্য বন্দী সৈনিকদের মনে বিক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিল। খাবারের মান ছিল অত্যন্ত নিম্ন, যখন তখন বন্দীদের উপর অত্যাচার করতো ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর সৈন্যরা, বন্দিদের থাকবার অস্থায়ী শিবির ছিল অত্যাধিক নোংরা আর অপর্যাপ্ত।

ছবি: রাজর্ষি রায়

ইতিহাস কি বলছে?

১৯৪৫ সালে নীলগঞ্জের ডিটেনশন ক্যাম্পের গণহত্যা অনেকটা ইতিহাসের অন্তরালে রয়ে গিয়েছে। পর্যাপ্ত প্রমাণ না থাকার কারণে ইতিহাসের পাতায় স্থান পায়নি এই গণহত্যার কথা। ব্রিটিশ আমলে যেখানে ডিটেনশন ক্যাম্প ছিলো সেখানে আজ সেন্ট্রাল রিসার্চ ইনস্টিটিউট ফর জুট এন্ড এ্যালায়েড ফাইবারসের ভারতবর্ষের হেড অফিস। একদা নীলগঞ্জের সমগ্র এলাকা জুড়ে নীল চাষ করা হতো আর সেই নীল চাষ থেকেই জায়গার নাম হয়েছিল নীলগঞ্জ। ১৯৪৫ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর যে ডিটেনশন ক্যাম্পে গণহত্যা হয়েছিল সেই ডিটেনশন ক্যাম্প ছিল নীলকুঠি । নীলকর সাহেবেরা এই নীলকুঠি থেকেই নীল চাষ পরিচালনা করতেন। আজও এই সাহেব বাগানের মধ্যে রয়েছে ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে ব্রিটিশ আমলের নাট বাড়ি। যা বর্তমানে সি, আর,আই ,জে ,এফ এর ফার্ম হাউস। সেই নাট বাড়িতে হত বাইজি নাচ। ঘরের মেঝেতে বড় বড় মাটির জালা উল্টো করে এমনভাবে সেট করা ছিল যাতে গান এবং বাইজিদের নাচ হলে শব্দ প্রতিধ্বনিত হত।

এক কথায় বলা যেতে পারে ব্রিটিশ আমলের ইকোসিসটেম। সেই বড় বড় মাটির জালা আজও রয়েছে। সঠিকভাবে ইতিহাসের পাতায় জায়গা না পেলেও কিছু কিছু তথ্য প্রমাণে উঠে এসেছে নীলগঞ্জের এই ঘটনার কথা। ১৯৪৫ সালের ১২ ই অক্টোবরে মেজর জেনারেল, এইচ,কিউ-এর একটি চিঠিতে এই ঘটনার কথা উল্লেখ রয়েছে। যে চিঠিটি জিএস বান্ড, ডি এম আই অর্থাৎ ডিরেক্টর অফ মিলিটারি এন্টালিজেন্স জিএইচকিউ দিল্লিতে পাঠানো হয়েছিল। সেই চিঠিতে উল্লেখ রয়েছে ১৯৪৫ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর রাতে নীলগঞ্জ ডিটেনশন ক্যাম্পের পাহারা দায়িত্বে ছিলেন ২৬/ ৩ মাদ্রাজ রেজিমেন্টের ক্যাপ্টেন ই আর আর মেনন। তিনি আই এন এ সোলজারদের ক্যাম্পে আসেন এবং রোল কল করার নির্দেশ দেন। বন্দিরা সেই রোল কলে হাজিরা দেওয়ার বিপক্ষে গেলে মেনন ক্যাম্প থেকে বন্দুক নিয়ে তেড়ে যান যুদ্ধবন্দীদের দিকে, সঙ্গে তখন সেনাবাহিনীর অন্যান্যরাও এগিয়ে আসে। অপরদিকে যুদ্ধবন্দীরা বাঁশ, ইট, লোহার রড নিয়ে ধেয়ে যায় সেনাবাহিনীর দিকে শুরু হয় অসম লড়াই। ওই রাতে তথ্য অনুযায়ী ১৫৮৩ জন যুদ্ধবন্দী নিহত হয়েছিল। তৎকালীন সময়ে জহরলাল নেহেরু, তার এক ভাষণে এ কথা স্বীকার করেছিলেন। সেই ভাষণের কথা তৎকালীন সময়ের এক সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছিল যার পেপার কাটিং রয়েছে নীলগঞ্জের নেতাজী সুভাষ মিশনের কাছে।

ছবি :পার্থ দাস

এই গণহত্যা কি আচমকাই হয়েছিল?

এই গণহত্যা আচমকাই হয়নি। ১৯৪৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে,বেশ কিছুদিন ধরেই বন্দী আজাদ হিন্দ বাহিনীর সেনাদের বিক্ষোভ চলছিল। আজাদ হিন্দ বাহিনীর পতনের পর বন্দী সৈনিকদের ঝিকরগাছা এবং নীলগঞ্জের ডিটেনশন ক্যাম্পে রাখা হয়েছিল। ঝিকরগাছাতেও বন্দীদের বিক্ষোভ ছিল তবে নীলগঞ্জের ডিটেনশন ক্যাম্পের বন্দীদের বিক্ষোভ ছিল অনেকটাই বেশি। আর সেই বিক্ষোভ চলাকালীন ২৫ সেপ্টেম্বরের দিন কয়েক আগে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার এক অর্ডিন্যান্স জারি করেছিল যাতে বলা হয়েছিল। বন্দীরা যদি নির্দেশ মেনে না চলে এবং ব্রিটিশ সরকারের সম্পত্তি ধ্বংস করলে তাদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার থাকবে ক্যাপ্টেন বা তার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের। এই অর্ডিন্যান্স জারির পিছনে ও ব্রিটিশ সরকারের ভয় ছিল। বিদ্রোহের আগুন তখন সারা দেশজুড়ে ধিকি ধিকি জ্বলছে। আজাদ হিন্দ বাহিনীর বন্দী সেনাদের ডিটেনশন ক্যাম্পে রাখার বিরুদ্ধে তখন অনেক ব্রিটিশ সেনানায়ক অভিমত পোষণ করেছিল। তাদের যুক্তি ছিল এই বন্দীরা বিদ্রোহ ঘোষণা করলে সেই বিদ্রোহের আঁচ ছড়িয়ে পড়তে পারে অন্যান্য জায়গায়। সেক্ষেত্রে তাদের কোন নির্জন স্থানে রাখার স্বপক্ষেই মত দিয়েছিলেন ব্রিটিশ আধিকারিকরা। ১৯৪৫ সালের ৬ই আগস্ট হিরোশমায় পরমাণু বোমা নিক্ষেপ হয় তার তিনদিন পর ৯ই আগস্ট নাগাসাকিতেও বোমা নিক্ষেপ করে আমেরিকা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঢেউ তখন ছড়িয়ে পড়েছে সারা বিশ্বময়। এমত পরিস্থিতিতে বন্দী আইএনএ সোলজারদের বিক্ষোভ প্রশমিত করার চেষ্টাও করেনি ব্রিটিশ সরকার। একদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশদের অংশগ্রহণের ফলে ভারতে ব্রিটিশরাজ প্রায় আস্থাচলের মুখে, আর অন্যদিকে স্বাধীনতা আন্দোলন থামানোর জন্য পর্যাপ্ত ব্রিটিশ সৈনিকের অভাব। ফলে যে অর্ডিন্যান্স জারি করেছিল ব্রিটিশ সরকার সেই অডিন্যান্সের কারণেই ১৯৪৫ সালের ২৫ শে সেপ্টেম্বর নীলগঞ্জের ডিটেনশন ক্যাম্পে ঘটেছিল গণহত্যা। সে ইতিহাস লোক চক্ষুর অন্তরালে থাকলেও বিগত কয়েক বছর ধরেই নীলগঞ্জের সাহেব বাগানে এই দিনটিকে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে স্মরণ করা হয়।

About Post Author