Home » ঘুমের দেশে ক্রিকেট তারকা সেলিম দুরানি

ঘুমের দেশে ক্রিকেট তারকা সেলিম দুরানি

পুরন্দর চক্রবর্তী,সময় কলকাতা,২ এপ্রিল :

রবিবার সকালে সেলিম দুরানি চলে গেলেন। ২৯ টি টেস্টে ৭৪ টি উইকেট ও ১২০২ রানের মালিক সেলিম দুরানি ছিলেন ক্রিকেটের প্রথম অর্জুন প্রাপক। বয়সজনিত সমস্যায় ভুগছিলেন, একাধিক রোগে জর্জরিত সেলিম দুরানি সম্প্রতি পড়ে গিয়ে পায়ের হাড় ভেঙেছিলেন। জামনগরের বাড়িতে থাকতেন ভাই জাহাঙ্গীর দুরানি ও ভাইপোর সঙ্গে। মৃত্যুকালে বয়স হয়েছিল ৮৮। তার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন নরেন্দ্র মোদি।তাঁর প্রয়াণে শেষ হল একটি অধ্যায়। এইসব তথ্যের মধ্যে প্রয়াত মানুষটিকে বেঁধে রাখা জানা যায় না। সেলিম দুরানিকে জানতে হলে ভারতীয় ক্রিকেটে তাঁর অবদান জানতে হবে, জানতে হবে কেন তিনি অসামান্য হয়ে উঠেছিলেন।

সেলিম দুরানি ভারতের হয়ে ১৩ বছর টেস্ট ক্রিকেট খেলেছেন। ১৯৬০ সালে তাঁর টেস্ট অভিষেক হয়েছিল। তিনি ছিলেন প্রকৃত অর্থে ভারতীয় ক্রিকেটের প্রথম সাড়া জাগানো অলরাউন্ডার। স্পিন বলটা ভালো করতেন, ছিলেন বিগ হিটার। লাগাতার ছয় মারা তাঁর কাছে ছিল যেন সবচেয়ে সহজ বিষয়।এ প্রসঙ্গে তিনি পরবর্তীতে বলেছেন, তাঁর সিক্সার ছিল দর্শকের প্রতি ‘ভালোবাসা’। কলকাতা, তৎকালীন বম্বে বা মাদ্রাজে মানুষ ছয় মারলে আরও ছয়ের আবদার করত। দর্শকদের আবদার টেস্টে মেটাতে তিনি কার্পণ্য করতেন না।

 

ব্যাট হাতে টেস্টে সেঞ্চুরি  বা প্রচুর ছয় মারার নজির থাকলেও বোলিংয়ের জন্য স্মরণীয় থাকবেন সেলিম দুরানি।এক টেস্টে দশ উইকেট পাওয়ার সাফল্য রয়েছে সেলিম দুরানির।জীবনের দ্বিতীয় টেস্ট সিরিজেই বোলিংয়ে নজর করেন সেলিম দুরানি। সেবার ইংল্যান্ডের বিপক্ষে নটি ইনিংসে ২৩ টি উইকেট পেয়েছিলেন তিনি। এরমধ্যে দুটি টেস্টে আঠেরোটি উইকেট ছিল তাঁর। তবে এর চেয়েও বড় সাফল্য ও প্রভাব রাখেন ক্রিকেট জীবনের শেষপ্রান্তে। তখন তাঁর বয়স ৩৭। ওয়েস্টইন্ডিজের মাটিতে ক্যারিবিয়ানদের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক সিরিজ জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন তিনি। পোর্ট অফ স্পেনে টেস্টে তাঁর বিশেষ ভূমিকা ছিল।ওয়েস্ট ইন্ডিজের মাটিতে ভারতের প্রথম সিরিজ জয়ের নির্ণায়ক টেস্ট ছিল পোর্ট অফ স্পেনের ম্যাচটি। সেই টেস্টে থিতু হতে দেওয়ার আগেই গ্যারী সোবার্স ও ক্লাইভ লয়েডকে সাজঘরে ফেরত পাঠান তিনি।

ছয় মারতে আশ্চর্যরকম পটু সেলিম দুরানিকে ইংল্যান্ডের সঙ্গে সিরিজে তাকে বাদ দেওয়ার পরে “নো দুরানি নো টেস্ট ” স্লোগান তুলেছিলেন ক্রিকেট প্রেমীরা। সেবার ফিরে এসেই মাঠে আলো ছড়ালেন দুরানি। ছয়ের বন্যায় ভরিয়ে দিয়েছিলেন প্রত্যাবর্তনের টেস্টে। এরকমই ছিলেন সেলিম দুরানি।

মাঠের মত মাঠের বাইরেও তিনি ছিলেন রাজকীয়। সুদর্শন সেলিম দুরানি মাঠের মত মাঠের বাইরেও ছিলেন স্টাইলিশ।তাঁর চলন বলন ছিল নায়কের মত। পারভীন বাবির সাথে একটি সিনেমাতেও তাঁকে বড় পর্দায় দেখা গিয়েছে।

সেলিম দুরানির ধমনীতে প্রবাহিত হত আফগান রক্ত। তার জন্মও আফগানিস্তানের কাবুলে।একদিক থেকে ভারতে বড় হওয়া ও ভারতের হয়ে আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলে খ্যাত সেলিম দুরানি আজকের রশিদ খানদের পূর্বসূরী ছিলেন। আজকের ক্রিকেটেও আফগানিস্তানে যেন দুরানির মতই স্পিনার-ব্যাটসম্যানদের রমরমা। সেলিম দুরানি অবশ্য ছিলেন সম্পূর্ণভাবে ভারতীয়।কাবুল থেকে এসে জামনগরেই কাটিয়ে গেছেন আজীবন। ভারতে ১৭০ টি প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে অত্যন্ত ধারাবাহিক ছিলেন দু দশক ধরে। ১৪ টি সেঞ্চুরি ও ৪৮৪ উইকেট পেয়েছেন ঘরোয়া ক্রিকেটে।তিনি ছিলেন ভারতীয় ক্রিকেট গৌরবের এমন একটি অধ্যায় যা চিরকাল অম্লান থেকে যাবে। শেষঘুমে ঘুমিয়ে পড়েছেন সেলিম দুরানি। তিনি না থাকলেও অক্ষয় থেকে যাবে ক্রিকেটে তাঁর অবদান।ভারতে ক্রিকেটের সঙ্গে একযোগে উচ্চারিত হতে থাকবে সেলিম দুরানির নাম।।

About Post Author