Home » অগ্নিগর্ভ বেহালা : দুর্ঘটনায় মৃত সৌরনীল, দায় কার?

অগ্নিগর্ভ বেহালা : দুর্ঘটনায় মৃত সৌরনীল, দায় কার?

সময় কলকাতা ডেস্ক, ৪ আগস্ট : দুর্ঘটনায় স্কুলপড়ুয়া সৌরনীল সরকারের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠল বেহালা। মৃতদেহ রাস্তায় ফেলে রেখে বিক্ষোভ দেখালেন স্থানীয়েরা। আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে পুলিশের ভ্যানে। বেশ কয়েকটি সরকারি বাস ভাঙচুর করা হয়েছে। স্কুলের ভেতরে কাঁদানো গ্যাসের সেল ফাটানোরও অভিযোগ ওঠে।তবে দুর্ঘটনার পরেই অভিযুক্ত লরির চালককে গ্রেফতারে তৎপর হয় পুলিশ।পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে ঘটনাস্থলে পৌঁছন কলকাতার পুলিশ কমিশনার (সিপি) বিনীত গোয়েল। তিনি বলেন, ‘‘যা ঘটেছে তা অত্যন্ত দুঃখজনক। এমনটা নয় যে ওখানে পুলিশ ছিল না বা থাকে না। কিন্তু কেন এই ঘটনা ঘটল তা খতিয়ে দেখতে তদন্ত করা হবে। ভবিষ্যতে যাতে এই ধরনের ঘটনা না ঘটে, তা-ও নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হবে।’’ প্রশাসন যাই বলুক না কেন,বেহালার দুর্ঘটনায় সাত বছরের সৌরনীল সরকারের মৃত্যু অনেক প্রশ্ন তুলে দিয়ে গেল। প্রতিটি দুর্ঘটনাই চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, আমাদের পথ চলতি জীবনের ত্রুটি-বিচ্যুতি। প্রশ্ন পুলিশের উদাসীনতা নিয়ে। প্রশ্ন রাস্তায় চলন্ত যানবাহনের ড্রাইভারদের গতি নিয়ন্ত্রণ নিয়ে। প্রশ্ন উঠছে, পথ চলতি মানুষের যাতায়াত নিয়ে। প্রশ্ন, প্রশাসনের উপযুক্ত পদক্ষেপ নিয়েও।

এই আগস্ট মাস ছিল হরিদেবপুর থানা এলাকার বাসিন্দা সরোজ সরকার ও দীপিকা সরকারের একমাত্র সন্তান সৌরনীল সরকারের জন্মমাস। ২৫ আগস্ট ছিল তাঁর জন্মদিন। কিন্তু আট বছরের জন্মদিন আর এল না,দুর্ঘটনা সৌরনীলকে কেড়ে নিল । ছেলের শোকে কেঁদে চলেছেন মা আর হাসপাতালে বিছানায় শুয়ে পাথর হয়ে আছেন তার বাবা। বড়িশা হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণীর ছাত্র সৌরনীল। বাবার সঙ্গে সাইকেলে প্রতিদিন স্কুলে যাতায়াত করত সৌরনীল। এদিন বাবার সঙ্গে সাইকেলে না এসে অটোতেই আসছিল সে । বেহালা চৌরাস্তার মোরে এক লহমায় ঘটে যায় দুর্ঘটনা। দুরন্ত গতিতে আসা লরির চাকায় পিষ্ট হয়ে যায় সাত বছরের পড়ুয়া। দুর্ঘটনায় যখন তার বাবাকে নিয়ে যাওয়া হয় হাসপাতালে। এক ঘন্টা ধরে প্রশাসনিক উদাসীনতায় রাস্তায় পড়ে থাকে মৃত সৌরনীলের পিষ্ট হওয়া দেহ। আর সেখান থেকেই প্রশাসনের প্রতি ক্ষোভ জন্ম নেয় এলাকার সাধারণ মানুষের মনে। খুবই ফেটে পড়ে নি স্থানীয় বাসিন্দারা। বড়িশা হাই স্কুলের সামনে বিক্ষোভ দেখাতে থাকেন ক্ষুব্ধ বাসিন্দারা। জ্বালিয়ে দেওয়া হয় পুলিশের গাড়ি,বাইক। ঘটনাস্থলের কিছুটা দূরেই পুলিশ ফাঁড়ি। একে অনিয়ন্ত্রিত যান চলাচলের ফলে খুদে পড়ুয়ার মৃত্যু,তাছাড়াও পুলিশের আসতে অস্বাভাবিক দেরি ও মৃতদেহ দীর্ঘক্ষণ ধরে পড়ে থাকা – এই অভিযোগ তুলে ক্ষুব্ধ এলাকার বাসিন্দারা তখন লাগামের বাইরে। প্রথমে বোঝানোর চেষ্টা করেও বোঝাতে ব্যর্থ হয়ে অবশেষে পুলিশ লাঠিচার্জ করে। স্কুলের গেটের সামনে বিক্ষোভরত জনতাকে হটাতে টিয়ার গ্যাস ছুড়ে পুলিশ। আহত হন পুলিশ এবং আমজনতা। টিয়ার গেছে তখন অসুস্থ হয়ে পড়েছে বহু শিশু। পুলিশের উপর ক্ষোভ উগড়ে দিয়ে অভিযোগ জানাতে গিয়ে কেঁদে ফেলেন প্রধান শিক্ষক।

বড়িশা হাই স্কুলে সকালবেলায় চলে প্রাথমিক বিদ্যালয় আর দুপুর বেলায় চলে উচ্চ বিদ্যালয় ফলে ছাত্র-ছাত্রী সংখ্যা প্রায় আড়াই হাজার। অথচ ছাত্র-ছাত্রীদের যাতায়াত এবং যানবাহন নিয়ন্ত্রণে বিদ্যালয়ের সামনে থাকেনা পুলিশ।এনিয়ে প্রশ্ন সাধারণ মানুষের মুখে ঘুরে ফিরে বেড়াচ্ছে। অভিযোগ উঠতে শুরু করেছে পুলিশের তোলাবাজির বিরুদ্ধে।

ইতিমধ্যে বেহালা দুর্ঘটনা ও অশান্তির ঘটনায় খুব প্রকাশ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মুখ্য সচিব হরেকৃষ্ণ দ্বিবেদির সঙ্গে কথা বলেছেন মুখ্যমন্ত্রী। লালবাজারে কাছে রিপোর্ট তলব করা হয়েছে নবান্ন থেকে। ঘটনা স্থল ঘুরে এসেছেন কলকাতা পুলিশের কমিশনার বিনীত গোয়েল সহ অন্যান্য আধিকারিকেরা। যাবতীয় আশ্বাসবাণীতে চিড়ে ভিজছে না।এখনও এলাকার বাসিন্দাদের মনে ক্ষোভের স্ফুলিঙ্গ জ্বলছে। এলাকার পরিস্থিতি এখন অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে,কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে যান চলাচল। নিভে গিয়েছে জ্বলতে থাকা পুলিশ গাড়ির আগুন, কিন্তু আগুন নেভেনি এলাকার বাসিন্দাদের মনের। আগুন নেভেনি সদ্য পুত্রহারা অসহায় মা-বাবার মনের। পুলিশ প্রশাসনের উদাসীনতার কারণেই এই দুর্ঘটনা এখনও মনে করছেন এলাকার বাসিন্দারা। হয়তো কিছুদিন প্রশাসন হবে তৎপর, এলাকা হবে আবার শান্ত। কিন্তু মনের অশান্তি নিয়ে দিনের পর দিন রাতের পর রাত বিনিদ্র রজনী যাপন করবেন সৌরনীলের বাবা-মা।।

About Post Author