সময় কলকাতা ডেস্ক, ১৪ নভেম্বর: পুজো পর্যায়ের শেষ পুজো কালীপুজো। বাঙালির বারো মাসের তেরো পার্বণের পরও পার্বণ আছে, শেষ নেই। মোড়ে -মোড়ে -অলিতে -গলিতে কালী পুজো হয়। কালীপুজো ধামাকা বলা যায়। নিকষ কালো অন্ধকারে করাল বদনা মা কালীর ভৈরবী রূপ মনে ভয় সঞ্চার করে। অসুর বিনাশকারিণী মুন্ড মালা পরিহিতা, রক্তে স্নাত শরীর,লোলুপ রক্তাক্ত জিহ্বা , এলোকেশী, ভয়ংকর রুদ্র রূপিণী দেবী হয়ে ওঠেন। কালীপুজোর সময় সৃষ্টি -সুন্দরের বিপরীতে দেবী অবস্থান করেন ভয়ঙ্করী রূপে। ভয়ে ভক্তিতে দেবী পুজিতা হন রাতে। তাই কালীপুজো হয়ে যায় কালিপুজো। তখন আলোর রোশনাই রাত দিনের আলোর মতো দীপ্যমান হয়ে ওঠে। কালীপুজো কখনো কলি পুজোতে পরিনত হয়। ডিজের কান ফাটানো শব্দে কখনো মনে হয় কালীপুজো নয়, শব্দ পুজো। নিষিদ্ধ বাজি আর ডিজের আওয়াজ কয়েক দিন ধরে সুন্দর জগৎকে নরকে পরিণত করে।
আরও পড়ুন শীতকালে চুলের পরিচর্যা করতে অবশ্যই মাথায় রাখুন এই বিষয়গুলি
তখন কালীপুজো শুধু কলি পুজোতে পরিনত হয়। তখন দেবী অসুর বিনাশকারিণী নয়। অসুরদের তান্ডবে সুরের অপমৃত্যু ঘটে। আনন্দ নিরানন্দ হয়ে যায়। কালো রাত আরো ভয়ংকর হয়ে ওঠে। সত্যি সত্যি ভূতের রাজ্যে সৃষ্টি হয়। কালী আরাধনায় সাধক রামপ্রসাদ সেন থেকে শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ দেব। তাঁদের কাছে দেবী মৃন্ময়ী থেকে চিন্ময়ী হয়ে ওঠেন। দেবী তাঁদের সঙ্গে খেলা করেন, ঝগড়া করেন,সুখ দুঃখের কথা বলেন। তখন স্বর্গের দেবী মর্ত্যে বিচরণ করেন। ইতিহাস খ্যাত ভবানী পাঠকের কথা আমরা অনেকে জানি। তিনি এবং তাঁর দলবল ডাকাতি করতে যাওয়ার আগে মাকে পুজো করতেন। তখন স্বদেশী আন্দোলন চলছে। তাঁরা ডাকাতি করতেন ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্যে। তখন কালীপুজো স্বদেশী আন্দোলন সমার্থক হয়ে ওঠে। ভবানী পাঠক থেকে দেবী চৌধুরানী দেশ মাতৃকার চরণে বলি প্রদত্ত প্রাণ ছিল। আজ থেকে প্রায় ৩৫০ বছর আগে সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের আনন্দমঠ-এর চরিত্র ডাকাত সম্রাট ভবানী পাঠক প্রথম এই পুজো শুরু করে। তিনি কালিন্দী নদী দিয়ে পূর্ববঙ্গে ডাকাতি করার উদ্দেশ্যে যাচ্ছিলেন, তার আগে এই পুজো করেন বলে জানা যায়। তবে ডাকাত ভবানী পাঠকের কালীপুজো এখন হিন্দু মুসলিম সম্প্রীতির উৎসবে পরিণত হয়েছে। প্রথা মেনে এখনও সাড়ে তিনশো বছরের কালীপুজো হয়ে ওঠে সম্প্রীতির উৎসব।
আরও পড়ুন দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপের ভ্রুকুটি, বুধ থেকেই ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা
এই পুজোর ইতিহাস জানায় এটি ডাকাতদের পুজো বলেই খ্যাত ছিল আগে। কথিত আছে আজ থেকে প্রায় ৩৫০ বছর আগে ভবানী পাঠক কালিন্দী নদী দিয়ে পূর্ববঙ্গে ডাকাতি করার উদ্দেশ্যে যাচ্ছিলেন। পথে বর্তমানে মালদার পুখুরিয়া থানার আড়াই ডাঙ্গা এলাকার নদীর ধারে তাঁর বজরা থামান। সেই সময় সেখানে আম বাগানের মধ্যে শিবির বানিয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। সেই সময় তিনি স্বপ্নাদেশ পান মা কালীর। স্বপ্নে মা কালী এসে তাকে এই আমবাগানে থান তৈরির আদেশ দেন। ভবানী পাঠক মা ভাবানীর এক রূপ হিসেবে ইতিহাসে খ্যাত।বনের মধ্যে ৭০০-৮০০ বছরের পুরানো বট গাছের তলায় দেবী চৌধুরানী মাটির মা কালীকে পুজো করতেন। দেবী চৌধুরানী ডাকাতির টাকা নিয়ে গরীবদের দান করতেন। তাই ইংরেজরা সহজে তাঁকে ধরতে পারতো না। শ্রদ্ধা,ভক্তি,আবেগ, দেশপ্রেমে দীক্ষিত স্বদেশীরা মা কালীর কাছে গুপ্ত মন্ত্রে শপথ নিতেন। এই সময় রক্ষে কালী হয়ে দেবী স্বদেশীদের রক্ষা করেন। কালী পুজো তখন আর এখনকার মধ্যে তফাৎ আছে। এখন পুজো মানে শুধু কালি পুজো , কালীপুজো নয়। অনুষ্ঠান আর আড়ম্বরে ভরপুর। বসনে -বিলাসে ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা কখন ভেঙ্গে পড়ে। শুধু হৈহুল্লোড়ের মধ্যে দিয়ে পুজোর সমাপ্তি ঘটে যেখানে শ্রদ্ধা -ভক্তি নেই সেখানে কখনো মনের শান্তি মেলে?


More Stories
‘দিল্লি কা লাড্ডু’ খেয়ে গাছের মগডালে : আহমেদ আনসারীর আশ্চর্য কাহিনী
পিছে পড়ে রইল মেয়ের অন্নপ্রাসন, তারাপীঠ থেকে তারার দেশে
হাতির করিডোরে ভয়ের উপত্যকায় খুদে দীপক-আয়ুষ নেই রাজ্যের বাসিন্দা