সময় কলকাতা ডেস্ক,২৩ নভেম্বর : ২০২৩ সালের নভেম্বর মাসে অশান্ত মনিপুর নিয়ে বেশ ভালোভাবে মাথা ঘামাতে শুরু করেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম।মণিপুরে অস্থিরতা ও যৌন হিংসা নিয়ে ব্রিটিশ মিডিয়ায় আলোড়ন পড়েছে বিভিন্ন চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমে যে প্রতিবেদন সামনে এসেছে, সেখানে মণিপুরে সাম্প্রতিক অশান্তি ও যৌন হিংসা চরম আকার নিয়েছে বলে প্রকাশিত হয়েছে। তুলে ধরা হচ্ছে এবছর এযাবৎ কাল পর্যন্ত ঘটে আসা মনিপুরের বিভিন্ন হিংসাত্মক ঘটনা। তবে সমস্যার শিকড় কোথায় তা পর্যালোচনা করতে গিয়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ব্রিটেনের সংবাদমাধ্যম মূল সমস্যার দিকে আলোকপাত না করে কেবলমাত্র ধর্মীয় বিষয়ের উল্লেখ করে সাম্প্রদায়িক সমস্যার দিকেই ফোকাস করেছে যা মনিপুরের জাতিগত সংঘর্ষের একটি ফলশ্রুতি মাত্র।
বিভিন্ন ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, মণিপুরের যাবতীয় হিংসাত্মক ঘটনাবলী সেখানে অস্থির সময়ে সংঘর্ষের ফলস্বরূপ সংঘটিত হয়েছে যা ২০২৩ সালের মে মাসে শুরু হয়েছিল, যাকে জাতিসংঘ সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছে। জাতিসংঘের রিপোর্টে বর্ণনা করা হয়েছে “প্রধানত হিন্দু মেইতেই এবং প্রধানত খ্রিস্টান কুকিদের জাতিগত সম্প্রদায়ের মধ্যে সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ ঘটছে “। তারা যোগ করেছে, “২০২২ সালের আগস্টের মাঝামাঝি পর্যন্ত, আনুমানিক ১৬০ জন নিহত হয়েছে, যাদের বেশিরভাগই কুকি জাতিগত সম্প্রদায়ের, এবং ৩০০ জনের বেশি আহত হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। জাতিগত সংঘর্ষের ফলে সম্প্রদায়ের কয়েক হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে,নারীদের ধর্ষণ করা হয়েছে,হাজার হাজার বাড়িঘর এবং শত শত গির্জা পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে, সেইসাথে কৃষিজমি ধ্বংস, ফসলের ক্ষতি এবং জীবিকার ক্ষতি হয়েছে।”
প্রতিবেদনগুলিতে এও উল্লেখ করা হয়েছে সংঘর্ষ সেখানেই থেমে থাকেনি। অন্যদিকে,বিবিসি রিপোর্ট অনুসারে, মনিপুরের বহু আলোচিত ঘটনাও বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে উত্তর-পূর্ব ভারতে একটি জনতা দুই মহিলাকে বিবস্ত্র করে, উলঙ্গ করে প্যারেড এবং গণধর্ষণ করেছে বলে অভিযোগ। একটি ভাইরাল ভিডিওতে তাদের ঘটনাটি প্রকাশ্যে এনেছে তার উল্লেখও ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম এই ঘটনাগুলির পরিপ্রেক্ষিতে নিজেদের মতামত প্রকাশ করতেও ভোলে নি। প্রতিবেদনের উপসংহারে বলা হয়েছে, মণিপুরে হিংসা যথা গণহত্যা এবং অন্যান্য নৃশংস অপরাধের ঝুঁকির কারণ এবং প্রাথমিক সতর্কতা চিহ্নগুলির বিরুদ্ধে এই জাতীয় সমস্ত প্রতিবেদনগুলি জরুরীভিত্তিতে তদন্ত করা উচিত। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম তাদের আগ্রহের কথা জানিয়ে বলেছে,ভারত সরকার কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত তদন্ত এই কাজটি দিতে পারে কিনা তা পরের মাসেই দেখা যাবে। যদি তা না হয়, তাহলে জাতিসংঘের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া এবং পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে বিবেচনা করা উচিত, যেমন একটি আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশন গঠন। সবমিলিয়ে, ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যমের আতস কাঁচের তলায় এখন মনিপুরের ঘটনাবলী।
একথা অনুস্বীকার্য যে, মেইতেই সম্প্রদায়ের ৮৩ শতাংশই হিন্দু এবং কুকিরাও মূলত খৃষ্টান ধর্মাবলম্বী তবুও সমস্যার জট ধর্মীয় কারণ নয় তার উল্লেখ ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমে সেভাবে তুলে ধরা হয় নি।
সমস্যার শিকড় যে ধর্মীয় কারণ নয় তার উল্লেখ ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমে নেই। উল্লেখ্য, মনিপুর সমস্যার জট দেখা দেয় মেইতেই জনগোষ্টীর সঙ্গে কুকি সহ অন্যান্য গোষ্ঠীর আইনি লড়াইকে কেন্দ্র করে। সংখ্যাগরিষ্ঠ মেইতেই সম্প্রদায়ের লোকজন তফশিলি উপজাতি তালিকাভুক্ত হওয়ার জন্য গত এক দশকের বেশি সময় দাবি করে আসছিল। স্বাধীনতার আগে তফশিলি উপজাতি হিসেবে স্বীকৃতি ছিল বলে দাবিও করেছে মেইতেই সম্প্রদায়। সংঘর্ষ বা সমস্যার সূত্রপাত ৩ মার্চ মণিপুর হাইকোর্টের একটি নির্দেশিকাকে কেন্দ্র করে । মেইতেই জনগোষ্ঠীকে তফশিলি উপজাতিভুক্ত করা কতটা সম্ভবপর , সেই বিষয় খতিয়ে দেখার জন্য মণিপুর সরকারকে খতিয়ে দেখার নির্দেশ দেয় হাইকোর্ট। হাইকোর্টের নির্দেশকে প্রতিবাদ জানিয়ে আন্দোলনে ঝাপিয়ে পড়ে কুকিরা। অতঃপর শুরু হয় কুকি – মেইতেই সংঘর্ষ।মেইতেইদের এই দাবির বিপক্ষে কুকি সম্প্রদায়ের প্রধান যুক্তি ছিল যে সরকার ও সমাজের উপর মেইতেইদের ইতিমধ্যেই শক্তিশালী প্রভাবকে আরও জোরদার করবে তাদের উপজাতি হিসেবে অবস্থান । পাশপাশি তাদের উপজাতি হিসেবে ঘোষণা করলে সেটা তাদের কুকি প্রধান অঞ্চলে বসতি স্থাপনের বা জমি কেনার সুযোগ দেবে। এই সংঘাত বিভিন্ন অভিমুখ নিয়েছে। শান্ত হয় নি মনিপুর। সেনাবাহিনী মনে করছে মনিপুর থেকে লুঠ হওয়া আগ্নেয়াস্ত্র পুনরুদ্ধার করতে পারলেই মনিপুর শান্ত হবে যা এখনও সম্ভবপর হয়নি। আর এই অবস্থায় ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম মনিপুরের অশান্ত অবস্থাকে তুলে ধরে একে আন্তর্জাতিক স্তরে সমাধান করার প্রচেষ্টায় রত, যা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।।


More Stories
তৃণমূল বিধায়ক ও সাংসদদের ভাবমূর্তি সমূলে ধ্বংস করে বড় জয় বিজেপির
জামাইকার বিরুদ্ধে লড়াই করে হারল ভারত
নাবালিকা ধ*র্ষণ-হ*ত্যার ঘটনায় পুলিশের হাসিঠাট্টা