Home » Lok Sabha Elections 2024:পাহাড়ে ভোটঃ দার্জিলিং জমজমাট

Lok Sabha Elections 2024:পাহাড়ে ভোটঃ দার্জিলিং জমজমাট

পুরন্দর চক্রবর্তী, সময় কলকাতা, ২৫ এপ্রিলঃ সত্যজিৎ রায়ের ফেলুদার রহস্য কাহিনীর নাম দার্জিলিং জমজমাট। প্রতিবার ভোট এলেই দার্জিলিং জমজমাট হয়ে ওঠে। পাহাড়ে ভোট-এর সময় বেশ কিছু জায়গায় ভোটের উত্তাপ না থাকলেও বঙ্গ ও দেশের চোখ থাকে দার্জিলিংয়ের দিকে। তাঁদের চোখে দার্জিলিংয়ের নির্বাচন যেন জমজমাট রহস্যঘেরা। বাস্তবেও লোকসভা নির্বাচনে বহু পালাবদলের সাক্ষী দার্জিলিং লোকসভা কেন্দ্র। কখনও কংগ্রেস, কখনও বাম , কখনও জিএনএলএফ জয়ী হয়েছে এখানে। ২০০৯ থেকে শুরু করে এখনও পর্যন্ত অবশ্য বিজেপি জয়ের টানা হ্যাটট্রিক করেছে। ২০১৯ সালের বিজেপি সাংসদ রাজু বিস্তা আবার দার্জিলিং কেন্দ্রে বিজেপির প্রার্থী। ২০১৯ সালে তিনি তৃণমূলের অমর সিং রাইকে চার লক্ষ ১৩ হাজারের বেশি ভোটে হারিয়ে দেন। ৫৯ শতাংশরও বেশি ভোট পেয়েছিলেন রাজু বিস্তা। এবারও ভোটের দৌড়ে তিনি হট ফেভারিট। তাঁর বিরুদ্ধে তৃণমূলের প্রার্থী গোপাল লামা।তিনি প্রাক্তন প্রশাসনিক কর্তা। জয়ের বিষয়ে তার আত্মবিশ্বাস ঝরে ঝরে পড়ছে।এই কেন্দ্রে অন্য উল্লেখযোগ্য প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন বাম সমর্থিত কংগ্রেস প্রার্থী মুনিশ তামাং,এবং নির্দল প্রার্থী বিষ্ণু প্রসাদ শর্মা। ভোটপ্রচারের শেষ লগ্নে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের চোখে , দার্জিলিং কেন্দ্রে বিজেপি এবারও বেশ ভালো জায়গায় রয়েছে । এর কারণ অনিত থাপা ও হামরো পার্টি থেকে কংগ্রেসে যোগদান করা অজয় এডওয়ার্ড বিজেপির বিপক্ষে থাকলেও বিনয় তামাং শেষ মুহূর্তে কংগ্রেস থেকে মুখ ঘুরিয়েছেন। তিনি সরাসরি বিজেপিকে ভোট দেওয়ার আহ্বান করছেন ভোট প্রচারের শেষ লগ্নে।তবুও কিছু অস্বস্তি ও কাঁটা রয়েছে বিজেপির। দার্জিলিং কেন্দ্র মানেই যে কেবলমাত্র পাহাড় দিয়ে ঘেরা কেন্দ্র তাও নয়। ফলে পাহাড় ও সমতলের চাওয়া পাওয়া ভিন্ন।পাহাড় ছাড়াও সমতলের বিস্তীর্ণ অংশ দার্জিলিং লোকসভা কেন্দ্রের আওতায় রয়েছে। এখানের সাতটি বিধানসভা কেন্দ্র হচ্ছে দার্জিলিং, কালিম্পঙ, কার্শিয়াং, মাটিগাড়া – নকশালবাড়ি, শিলিগুড়ি, ফাঁসিদেওয়া এবং চোপড়া। এরমধ্যে ২০২১ সালে বিধানসভা নির্বাচনে চোপড়াতে জয়ী হওয়া ছাড়া তৃণমূল কোথাও সুবিধা করতে পারেনি। কালিম্পং বিধানসভা কেন্দ্রে জয়ী হয়েছিল গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা। বাকি পাঁচটি বিধানসভা কেন্দ্রেই ২০২১ সালে জয়ী হয় বিজেপি।

 

২০১৯ বা ২০২১ সালের দার্জিলিং লোকসভা এলাকার নির্বাচনের চিত্র কী পাল্টেছে? ভোটের রঙ পাল্টানোর কোনও সম্ভাবনা কি আদৌ রয়েছে? প্রথমে আসা যাক পাহাড়ের সমীকরণে। পাহাড়ে যার কর্তৃত্ব এখন কতটা অটুট আছে তা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও বিমল গুরুং অবশ্যই পাহাড়ের রাজনীতিতে একটি উল্লেখযোগ্য নাম। স্বতন্ত্র রাজ্য গোর্খাল্যান্ডের সমর্থক গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা বিমল গুরুং বারবার রাজনৈতিক রঙ বদলেছেন। একদা এনডিএ -র সঙ্গে ছিলেন, ২০১৭ সালের পরে একাধিক মামলায় জেরবার হয়ে তিনি অজ্ঞাতবাসে চলে যান।প্রায় তিন বছর গা ঢাকা দিয়ে থাকার পরে ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে তৃণমূলের হাত ধরেন এবং পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে মা সম্বোধন করেন। কিন্তু২০১৭ সালের পর থেকেই পাহাড়ের রাশ চলে যায় বিনয় তামাং ও অমিত থাপাদের হাতে। বিমল ২০২৪ সালের নির্বাচনের আগে আবার এনডিএ -র হাত শক্ত করার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন। সম্প্রতি রাজু বিস্তাকে জয়ী করার জন্য তাঁর আহ্বান শুনে তার অনুগামীরা ক্ষুব্ধ হন।বেগতিক দেখে রাজু বিস্তার বিপক্ষে তিনি মুখ খুলেছেন।পৃথক রাজ্যের কথা না বললে তিনি রাজু বিস্তা-র সঙ্গে থাকবেন না জানিয়েছেন এবং পাহাড়ে বিজেপির ভোট কমবে বলেও দাবি করেছেন। একটি বক্তব্য জানিয়ে স্ট্যান্ড পয়েন্ট থেকে ঘুরে যাওয়া নতুন কিছু নয় বিমল গুরংয়ের। কিছুদিন আগেই তিনি বলেছিলেন পাহাড়ের উন্নয়ন হয়েছে কংগ্রেসের হাত ধরে। সবাই যখন ভাবছিলেন তিনি লোকসভায় কংগ্রেসকেই সমর্থন করবেন ভাবা হচ্ছিল তখন উল্টো পথে হাঁটেন তিনি। সেখানেও তিনি স্থির থাকছেন না। তাঁর অবস্থান পাল্টায় দেখে তার অনুগামীরাও তার সঙ্গে থাকেন না প্রায়শ তাঁর সঙ্গ ত্যাগ করেন, বিমল গুরুং তখন আবার নিজের অবস্থান পাল্টাতে শুরু করেন।ফলশ্রুতি বিমল গুরুং এ মুহূর্তে পাহাড়ে কতটা প্রভাবশালী নাম তা নিয়ে এই মুহূর্তে রয়েছে প্রশ্ন চিহ্ন। আর এখানে উঠে আসছে পাহাড় তবে কার হাতে? বিমল গুরংয়ের প্রভাব কমতেই প্রভাব বেড়েছে অনিত থাপা বিনয় তামাংদের।

আরও পড়ুন   এসএসসি নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় অযোগ্য চাকরি প্রার্থীদের তালিকা চেয়ে পাঠাল সিবিআই

দার্জিলিং পুর নির্বাচনে অজয়ের হামরো পার্টির আধিপত্য থাকলেও ২০২২ সালের জিটিএ নির্বাচনে অনিত থাপার ভারতীয় গোর্খা প্রজাতান্ত্রিক মোর্চা ৪৫টি আসনের মধ্যে ২৭ টিতে জয়ী হয়।তাঁর সঙ্গে এবারের ভোটে তৃণমূলের গাঁটছড়া রয়েছে। ভারতীয় গোর্খা প্রজাতান্ত্রিক মোর্চার আবার চা বাগানে কিছুটা হলেও সংগঠন রয়েছে । গোর্খা প্রজাতান্ত্রিক মোর্চা আবার এবারের ভোটে তৃণমূলের জোট সঙ্গী। চা বাগানে অনিত থাপা ও তৃণমূলের মেলবন্ধন তাগড়াই হলে তা রাজু বিস্তার দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে উঠতে পারে তবুও পাহাড়ে বিজেপির সমস্যা একাধিক। দার্জিলিং সহ পাহাড় এবং চা বলয়ে একাধিক গোষ্ঠী ও বিভিন্ন নেতার বিজেপির ছাতার তলায় চলে আসা শ্রুতিমধুর শোনালেও নেতা ও গোষ্ঠীরা ভিন্ন ভিন্ন মেরুর বাসিন্দা । যেমন বিমল গুরুং ও জিএনএলএফের মন ঘিসিং রাজু বিস্তাকে সমর্থন করছেন নিজেদের অস্তিত্ব বাঁচাতে। অথচ জিএনএলএফের রাজনৈতিক সংকট বিজেপি জিতলে কতটা কাটবে তারচেয়েও বড় প্রশ্ন বিজেপির ফল খারাপ হলে মন ঘিসিংয়ের কি হাল হবে? আরও কি সংকটে পড়বে না সুভাষ ঘিসিংয়ের নামের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা জিএনএলএফের। সমস্যা রয়েছে বিমল গুরুং ও মন ঘিসিংয়ের পাহাড়ে ষষ্ঠ তফসিলে স্বশাসনের প্রশ্নে। একাংশ চাইছেন স্বশাসন, একাংশ চাইছেন রাজনৈতিকভাবে সমস্যার সমাধান। অথচ তাঁরা জানেন না বিজেপি পৃথক গোর্খাল্যান্ডের তত্ত্ব সমর্থন করবেন কিনা। তাই গুরুং বলছেন, পৃথক রাজ্যের প্রশ্নে রাজু বিস্তা পাশে না থাকলে তিনি রাজু বিস্তার পাশে নেই। অথচ স্বশাসনের তত্ত্ব নিয়ে কাটাছেঁড়ার বাইরেও বিজেপি বেশ কিছু ক্ষেত্রে চাপে।

 

তবুও বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব মনে করছে না ঠান্ডাঘরের তত্ব তাঁদের কোনঠাসা করে দেবে। উদাহরণ কার্শিয়াং। এখানে বাম সমর্থিত কংগ্রেস প্রার্থী মনীশ তামাংয়ের বেশ কিছুটা জনসমর্থন রয়েছে। কিন্ত বিনয় তামাং তাঁর প্রার্থী পদ নিয়ে অখুশী ছিলেন। বিনয়ের কংগ্রেস ত্যাগের কারণ ও কংগ্রেস প্রার্থী নির্বাচন। অন্যদিকে এখানের বিজেপির বিধায়ক ছিলেন বিষ্ণুপ্রসাদ শর্মা।তিনি এবার লোকসভা নির্বাচনের নির্দল প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ।২০২১ সালে বিধানসভা নির্বাচনে ভালো ভোট পেয়েছিলেন তিনি তবে তাঁর নিজস্ব সংগঠন ও মেসিনারি কতটা জোরদার তা নিয়ে রয়েছে প্রশ্ন। তার সঙ্গে কার্শিয়াং এর নাড়ির যোগ কতটা তা নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন।তবুও প্রশ্ন উঠছে কার্শিয়াং-এ প্রতিটি বুথে বিজেপি এজেন্ট বসাতে পারবে তো? অবশ্য রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন বিজেপি কোনওবারই সব বুথে লোক দিতে পারেনি তবুও ভোটে সাফল্য এসেছে। আবার, কালিম্পংয়ে গোর্খা জন মুক্তি মোর্চা বিজেপির পাশে আছে, আছেন বিজেপির পাহাড় কমিটির নেতা কল্যাণ দেওয়ান – ফলে কালিম্পং এর পরিস্থিতি বিজেপির অনেকটাই ভালো।তবুও সবমিলিয়ে যদিও পাহাড়ে এবারের ভোটে বিজেপির বিরুদ্ধে বেশ কিছু প্রশ্ন উঠেছে ।।প্রশ্ন কী কী যা বিজেপির অস্বস্তির কারণ ? বিগত তিনবার সংসদ বিজেপির, অথচ পাহাড় বলছে দাবিদাওয়া মানার কথা বলা হলেও প্রতিশ্রুতি রক্ষা হয়নি । কারণ স্বশাসন ছাড়াও অনেক ইস্যু রয়েছে যেখানে প্রতিশ্রুতি দিয়ে তা পালন করা হয়নি বলেই অভিযোগ পাহাড়ের । পাহাড় জানতে চায় , ১১ জনজাতির স্বীকৃতি কোথায় গেল? রাজু বিস্তা বলছেন ২৬ এর বিধানসভার আগে গোর্খা ও জনজাতির সমস্যার সমাধান হবে।

আরও পড়ুন  গাইঘাটা হত্যাকান্ড : দাদা খুন, ভাই আটক

বাস্তব হচ্ছে,পাহাড়ে এখন আধিপত্য জিএনএলএফ,জনমুক্তি মোর্চা, হামরো বা বিজেপির হাতে কুক্ষিগত নেই। তবুও কেবলমাত্র পাহাড়ে দাবিদাওয়া না মেটা বা অপ্রাপ্তি সার্বিকভাবে দার্জিলিং কেন্দ্রে বিজেপিকে খুব বিপাকে নাও ফেলতে পারে । এর কারণ দার্জিলিং লোকসভা কেন্দ্রের মধ্যে পাহাড়ে বিজেপির ভোট কিছুটা কমলেও শুধুমাত্র পাহাড় দিয়ে দার্জিলিং লোকসভা কেন্দ্রের ফলাফল নির্ধারিত হবে না। দার্জিলিং লোকসভা কেন্দ্রে পাহাড় ছাড়িয়ে চোখ রাখা যাক সমতলের দিকে। সমতলে কতটা স্বস্তিতে আছে বিজেপি ? এখানে বিপক্ষের কতটা শক্তিবৃদ্ধি পেয়েছে।প্রথমেই বলা যাক চোপড়ার কথা। হামিদুল রহমান এখানের তৃণমূল বিধায়ক। উত্তর দিনাজপুরের চোপড়াতে ভোট মেশিনারি পরিচালিত হয় হামিদুল রহমানের অঙ্গুলি হেলনে। স্থানীয় মন্দির ইস্যুতে হিন্দু ভোটকে এককাট্টা করানোর চেষ্টা হলেও খুব একটা লাভ হয়েছে কিনা সন্দেহ রয়েছে। এবারের লোকসভা ভোটেও চোপড়াতে বিজেপি দাঁত ফোটাতে পারবে বলে রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন না। তবে দার্জিলিং লোকসভা কেন্দ্রের সমতলের বাকি অংশের চিত্র মোটেই চোপড়ার সঙ্গে মিলবে না। উন্নয়ন এবং দুর্নীতির প্রশ্নে শিলিগুড়ি, ফাঁসিদেওয়া, মাটিগাড়া -নকশালবাড়ি তিনটি কেন্দ্রেই ২০১৯ সালের লোকসভা ও ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে নির্বাচনের রিপিট টেলিকাস্ট হবে বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল । এই তিনকেন্দ্রের কিছু কিছু জায়গায় তৃণমূল থাবা বসালেও , পাহাড় বিজেপির ওপরে কিছু বিষয়ে ক্ষুব্ধ থাকলেও অধিকাংশ বিধানসভা কেন্দ্রে শাসক দলের বিরুদ্ধে বেশ কিছু ক্ষোভ রয়েছে যা বিজেপির স্বস্তির কারণ। ফলশ্রুতি, তৃণমূল প্রার্থী গোপাল লামার জয়ের বিষয়ে সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে । তৃণমূলের জয়ের খুব বেশি আশা দেখছে না রাজনৈতিক মহল। রাজু বিস্তা কিছুটা হলেও এগিয়ে আছেন , ভোট প্রচারের শেষ লগ্নে এমনটাই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা।।

#তৃণমূলপ্রার্থীগোপাললামা

#বিমলগুরুং

#LokSabhaElectioninDarjeeling

About Post Author