সময় কলকাতা ডেস্ক:- মণিপুরের মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দিলেন এন বিরেন সিং। মণিপুরে জাতি দাঙ্গা শুরু হয়েছিল ২০২৩-এর ৩ মে। মাসখানেকের মাথায় মুখ্যমন্ত্রী এন বীরেন সিংহের পদত্যাগের দাবিতে উত্তাল হয়েছিল রাজ্য। সংঘর্ষ শুরুর ৬৪৯ দিন পর পদত্যাগ করলেন বীরেন সিং।
রবিবার রাজভবনে গিয়ে রাজ্যপাল অজয় কুমার ভল্লার হাতে পদত্যাগপত্র তুলে দেন বীরেন সিং। সঙ্গে ছিলেন বিজেপি নেতা সম্বিত পাত্রও। মণিপুরে জাতি দাঙ্গা শুরু হয়েছিল ২০২৩-এর ৩ মে। মাসখানেকের মাথায় মুখ্যমন্ত্রী এন বীরেন সিংহের পদত্যাগের দাবিতে উত্তাল হয়েছিল রাজ্য। মাস ছয়েকের মাথায় পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়ে রাজভবনের দিকে রওনা হয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। কিন্তু নাটকীয় ঘটনা ঘটে মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবনের বাইরে। একদল মহিলা মুখ্যমন্ত্রীর হাত থেকে পদত্যাগ পত্র কেড়ে নেন। তারা দাবি করেন, বীরেনের পদত্যাগ করা চলবে না। গাড়ি ঘুরিয়ে বাড়ি ফিরে যান এন বীরেন সিং। তবে শেষমেশ মণিপুরে জাতিদাঙ্গা শুরুর ৬৪৯ দিনের মাথায় রবিবার পদত্যাগ করেন বীরেন।
কী এমন ঘটল যে রবিবার আচমকাই পদত্যাগ করলেন মণিপুরের মুখ্যমন্ত্রী?
আসলে দলীয় বিধায়কদের আস্থা হারিয়েছেন বীরেন সিং। তার স্বজাতি মেইতেই বিধায়করা পর্যন্ত মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। ৬০ আসনের বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণে ৩১ জন বিধায়কের সমর্থন প্রয়োজন। সেখানে বীরেনের পাশে বর্তমানে আছেন মাত্র ১৫ জন বিধায়ক। তাঁদের মধ্যে আবার জেডিইউ এবং নির্দল বিধায়কেরাও রয়েছেন। তাই বিজেপির সিংহভাগ বিধায়কের আস্থা হারিয়ে গদি বাঁচানোর তুমুল চেষ্টা চালাচ্ছিলেন বীরেন সিং। কিন্তু এবার পাশে থাকা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ মণিপুরের মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে বীরেনকে সরে যেতে বলেন। শাহের সিদ্ধান্ত জানার পর আর দেরী করেননি বীরেন সিং। এক বছর আগে বীরেন পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন কুকি জনজাতির আন্দোলনের চাপে। স্বজাতি বীরেনকে তখন রক্ষা করতে এগিয়ে গিয়েছিল মেইতেইরা। মেইতেইদের নারী সংগঠনের সদস্যরাই ঘিরে রেখেছিল মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবন। তারা মনে করেছিল স্বজাতি বীরেনের পদত্যাগ কুকিদের সঙ্গে লড়াইয়ে তাদের পিছিয়ে দেবে। বীরেন থাকা মানে মেইতেইরা নিরাপদ। কিন্তু মেইতেইদের আশা পূরণ হয়নি। কুকিদের আক্রমণ থেকে মেইতেইদের রক্ষা করতে পারেনি বীরেনের সরকার। গত এক-দেড় মাসে বেশিরভাগ হামলার শিকার হয়েছে মেইতেইরা।
বীরেনের পদত্যাগ দাবি
তার আগেই পনেরজন বিধায়ক প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে বীরেনের অপসারণ দাবি করেন। তাঁদের বেশিরভাগই মেইতেই সম্প্রদায়ের। দিন কয়েক আগে উনিশজন বিধায়ক প্রকাশ্যে বীরেনের পদত্যাগ দাবি করেন। তাঁদেরও বেশিরভাগই ছিলেন বিজেপির। দলেরই সিংহভাগ বিধায়কের আস্থা হারিয়েছেন বুঝে বিধানসভার অধিবেশন ডাকছিলেন না বীরেন। আস্থা ভোটে পরাজয়ের ভয়ে গত বছর বিধানসভার শীতকালীন অধিবেশন পর্যন্ত ডাকেননি। চলতি ফেব্রুয়ারিতে বিধানসভার বাজেট অধিবেশন ডাকা নিয়েও টালবাহানা করছিলেন। দিন গুণছিলেন অমিত শাহের মুখ থেকে বিজেপি বিধায়কদের তাঁর পাশে থাকার বার্তার জন্য। কিন্তু বীরেনের সেই ইচ্ছায় জল ঢালে গত সপ্তাহে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির নির্দেশ। গত বছর একটি ফোনালাপ ফাঁস হয়েছিল। তাতে একজনকে কুকিদের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক মন্তব্য করতে শোনা যায়। অভিযোগ ওই কণ্ঠস্বর মুখ্যমন্ত্রী বীরেনের।
ফরেনসিক রিপোর্ট
এ নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে হওয়া মামলায় প্রধান বিচারপতি সরকারের কাছে ওই ফোনালাপের ফরেনসিক রিপোর্ট চেয়েছেন। তাৎপর্যপূর্ণ হল, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পরই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ দিল্লিতে তলব করেন বীরেনকে। জাতি দাঙ্গা শুরুর পর থেকে এতদিন পর্যন্ত বীরেনকে সমর্থন জুগিয়ে গিয়েছেন শাহ। মনে করা হয় সেই কারণেই মণিপুর নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মাথা গলাননি। কিন্তু চলতি পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় সরকার এবং বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বকে বীরেনকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে হল। মণিপুরে আপাতত রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করা হতে পারে।
উত্তরসুরি নির্বাচন
মুখ্যমন্ত্রী এন বীরেন সিং রবিবার পদত্যাগ করলেও তাঁর উত্তরসুরি নির্বাচন করে উঠতে পারেনি বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। জাতিদাঙ্গায় বিধ্বস্ত রাজ্যটিতে নেতা বাছতে তাড়াহুড়ো করতে চান না বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব। মনে করা হচ্ছে, রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করে নতুন মুখ্যমন্ত্রী বাছাইয়ে ভাবনাচিন্তা করে সিদ্ধান্ত নেবে কেন্দ্র। বীরেন বিধানসভা ভেঙে দেওয়ার সুপারিশ করলেও কেন্দ্র সেই পথে নাও এগতে পারে। গত দেড় বছরের বেশি সময় ধরে জাতিহিংসায় উত্তপ্ত উত্তরপূর্বের রাজ্য। কয়েকশো মানুষের মৃত্যু হয়েছে। ঘরছাড়া অসংখ্য মানুষ। যার জেরে আঙুল উঠেছিল মণিপুরের বিজেপি সরকার এবং মুখ্যমন্ত্রী বীরেন সিংয়ের বিরুদ্ধে। একাধিক বার তাঁর পদত্যাগের দাবি করে বিরোধী দলগুলি। শেষ পর্যন্ত ঘরে-বাইরে চাপের মুখে পদত্যাগ করতে বাধ্য হলেন বীরেন সিং। পদত্যাগপত্রে বিরেন লিখেছেন, এত দিন মণিপুরের মানুষের সেবা করতে পেরেছেন, এটা তাঁর কাছে সম্মানের। মণিপুরবাসীর স্বার্থে সময়োপযোগী পদক্ষেপ করা এবং নানা উন্নয়নমূলক প্রকল্প বাস্তবায়িত করার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের কাছেন তিনি কৃতজ্ঞ।


More Stories
যুদ্ধের জাঁতাকলে ভারত
আবার বিজয়ী, ইতিহাস গড়ল ভারত
কেরলের নামবদল : প্রেক্ষাপট ও বিতর্ক