সময় কলকাতা ডেস্ক:- বহুযুগ আগে একটা সময় ছিল, যখন আদিগঙ্গার জলে স্নান করে শুদ্ধ মনে কালীঘাট মন্দিরে পুজো দিতে যেতেন পুণ্যার্থীরা। স্নানের জন্য কালীঘাট মন্দিরের অদূরেই, আদিগঙ্গার পাড়ে সুদৃশ্য ঘাট নির্মাণ করে দিয়েছিলেন রানি রাসমণি। কিন্তু গত কয়েক দশকে অবহেলায় অযত্নে এবং অবশ্যই উদাসীনতায় আজ আদিগঙ্গা পরিণত হয়েছে টালি নালায়। জলে দূষণের মাত্রা এতটাই ভয়ঙ্কর যে, সেই নোংরা, কালচে এবং দুর্গন্ধ জলে স্নান করা তো দূর, পা ডোবাতেও ভয় পান মানুষ। টালি নালার এখন অবস্থা নালা-নর্দমার মতো নোংরা।
গ্রীন ট্রাইব্যুনালের নির্দেশ রয়েছে আদিগঙ্গার সংস্কারের
বর্তমানে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সাধারণ মানুষ শুধুমাত্র কালীঘাট মন্দিরে পুজো দিতে আসেন এমনটা নয়। বহু সাধারণ মানুষ আসেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ি দেখতে। কলকাতা পুরসভা সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে সকল মানুষ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ি দেখতে আসবেন তারা যেন আদিগঙ্গায় পূর্ণস্নান করতে পারেন। আর তাই কলকাতা পৌরসভা উদ্যোগ নিয়েছে টালি নালা সংস্কারের। যদি দীর্ঘদিন ধরে গ্রীন ট্রাইব্যুনালের নির্দেশ রয়েছে আদিগঙ্গার সংস্কারের। সেই কাজ এতদিন ঢিলে গতিতে চলছিল।
গ্লোবাল টেন্ডার ডাকা হয়েছে
খিদিরপুরের দইঘাটের কাছে আদিগঙ্গা ও গঙ্গা যেখানে মিশছে, সেখানে তৈরি হবে নতুন ব্যারাজ। আদিগঙ্গার জল পরিষ্কার রাখতে তৈরি করা হবে নতুন সুয়ারেজ পাম্পিং স্টেশন। যা আদিগঙ্গার দূষিত জলকে শোধন করে ফের আদিগঙ্গায় ফেলবে। এর ফলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই আদিগঙ্গা তার সেই পুরোনো চেহারা ফিরে পাবে। আগের মতো আদিগঙ্গায় সারা বছর ধরে প্রবাহিত হবে গঙ্গার জল। চাইলে আদিগঙ্গায় স্নানও করতে পারবেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ি ও কালীঘাট মন্দির দেখতে আসা পুণ্যার্থীরা। তা ছাড়া, কেওড়াতলা শ্মশানে মৃত নিকটজনের দেহ দাহ করার পর গঙ্গাস্নানের জন্য আর ছ’কিলোমিটার দূরে বাবুঘাটে যেতে হবে না। আদিগঙ্গার দুপাশের পরিবেশও সাজিয়ে তোলা হবে। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য কলকাতা পুরসভার প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট বিভাগের তরফে দিন কয়েক আগেই গ্লোবাল টেন্ডার ডাকা হয়েছে।
নাব্যতা কমে গিয়েছে আদিগঙ্গার
এখন বিষয় হল, দক্ষিণ কলকাতার বিভিন্ন অংশের নিকাশি ব্যবস্থার নালা নিয়ে আসা হয়েছে আদিগঙ্গায়। যার ফলে বিস্তীর্ণ এলাকার নোংরা জল দশকের পর দশক ধরে আদিগঙ্গায় এসে মিশেছে। দীর্ঘদিন ধরে ড্রেজিং না হওয়ার কারণে পলি জমতে জমতে নাব্যতা কমে গিয়েছে আদিগঙ্গার। যদিও পরিবেশ আদালতের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও এখনো পর্যন্ত সেই অর্থে টালি নালা সংস্কারের কাজ সেই ভাবে এগোয়নি। আবার নতুন একটি প্রকল্প। কলকাতা পুরসভার নিকাশি বিভাগের মেয়র পারিষদ তারক সিং জানাচ্ছেন, আদিগঙ্গার সঙ্গে সরাসরি যোগ রয়েছে গঙ্গার। গঙ্গায় যখন জোয়ার আসে, তখন সেই জলে আদিগঙ্গা পরিপুষ্ট হয়। আবার ভাটার সময়ে সেই জল বেরিয়ে যায়। কারণ, সেখানে কোনও গেট নেই। ফলে, জোয়ারের সময় টুকু ছাড়া বাকি সময়ে আদিগঙ্গায় খুব বেশি জল থাকে না।
তবে আদিগঙ্গার কিছু অংশ যেমন, কালীঘাট থেকে আলিপুর পর্যন্ত অংশে নাব্যতা বেশি হওয়ায় সেখানে জল জমে থাকে বেশি পরিমাণে। তখন সেটা বদ্ধ জলাশয়ে পরিণত হয়। জোয়ারের সময়ে জলের স্রোতে ভেসে আসা আবর্জনা জমা হয় আদিগঙ্গার বুকে। সেই সঙ্গে গঙ্গার দু’পাড়ে থাকা নিকাশি নালার জলও মিশছে আদিগঙ্গায়।
মেয়র পারিষদ তারক সিং জানিয়েছেন
এই দূষণ থেকে আদিগঙ্গাকে মুক্ত করতেই দইঘাটের কাছে আদিগঙ্গা ও গঙ্গার সংযোগস্থলে একটি ব্যারাজ নির্মাণ করা হবে। যার সাহায্যে নিয়ন্ত্রণ করা হবে আদিগঙ্গায় জলের প্রবাহকে। জোয়ারের সময়ে গঙ্গা থেকে আদিগঙ্গায় ঢোকা জল যাতে ভাটার সময়ে আর বেরিয়ে না যায়, সে জন্য স্লুইস গেট বন্ধ করে দেওয়া হবে।’ মেয়র পারিষদের বক্তব্য, ‘আদিগঙ্গায় জলের প্রবাহ ঠিক রাখার পাশাপাশি তাকে দূষণমুক্ত রাখতে একটি সুয়ারেজ পাম্পিং স্টেশন বানানো হবে। সেখানে আদিগঙ্গার দূষিত জলকে শোধন করার পর তা পুনরায় ফেলা হবে আদিগঙ্গাতেই।’ পুরসভার প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট বিভাগের ডিজি অমিতাভ চক্রবর্তী জানিয়েছেন, ‘দইঘাটে যেটা তৈরি হচ্ছে, সেটা একাধারে ব্যারাজ ও লকগেট, দু’টোরই কাজ করবে।’ এর ফলে, জোয়ারের সময়ে আদিগঙ্গায় হুহু করে গঙ্গার জল ঢুকবে।
দীর্ঘ এক দশকের বেশি সময় ধরে ন্যাশনাল গ্রিন ট্রাইবুনালের নির্দেশে আদিগঙ্গা বা টালি নালার পুনরুজ্জীবনের কাজ চলছে। যদিও এতে আদিগঙ্গার বর্তমান চরিত্রের যে খুব বেশি একটা বদল হয়েছে এমনটা নয়। দইঘাটের কাছে শুধু ব্যারাজ তৈরি করে আদিগঙ্গার দূষণ কমবে যাবে, এমনটা মনে করছেন না পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা। টালিনালার দু’পাশে প্রায় ১০০টি নিকাশী নালা রয়েছে। দক্ষিণ কলকাতার বিস্তীর্ণ অংশের নোংরা জল সেগুলো দিয়ে আদিগঙ্গায় এসে মেশে। এর পাশাপাশি রয়েছে আদিগঙ্গায় নোংরা-আবর্জনা ফেলার সমস্যা। এইসব বন্ধ করা না গেলে আদিগঙ্গাকে তার পুরনো চেহারায় ফেরানো অসম্ভব বলেই মনে করেন পরিবেশবিদরা।


More Stories
কলকাতা-হিমাচল সরাসরি ট্রেন চালু, বাংলা পর্যটকদের জন্য নতুন সুবিধা
কালীঘাটে মমতার বাড়ির দোরগোড়ায় সিআইডি
তৃণমূল বিধায়ক ও সাংসদদের ভাবমূর্তি সমূলে ধ্বংস করে বড় জয় বিজেপির