Home » ডুয়ার্সের বিভিন্ন গ্রামে এখন আলোর রোশনাই, কারণ কি? কারণ শুনলে অবাক হয়ে যাবেন

ডুয়ার্সের বিভিন্ন গ্রামে এখন আলোর রোশনাই, কারণ কি? কারণ শুনলে অবাক হয়ে যাবেন

ডুয়ার্সের বিভিন্ন গ্রামে এখন আলোর রোশনাই, কারণ কি? কারণ শুনলে অবাক হয়ে যাবেন

সময় কলকাতা, সানি রায়, উত্তরবঙ্গ:-  ১৯৭১-এ মুক্তি পাওয়া অত্যন্ত জনপ্রিয় অভিনেতা রাজেশ খান্নার হাতি মেরে সাথী সিনেমার কথা আজও কেউ ভোলেনি। চলচিত্রের নামেই বোঝানো হয়েছিল যে জঙ্গলে বাস করা এক প্রাণীর সঙ্গেও মানুষের নিবিড় সম্পর্ক সত্যিই তৈরি হতে পারে। যে সম্পর্ক ভালোবাসার, সহযোগিতার, সুখ-দুঃখ ভাগ করে নেওয়ার। তবে প্রাণীদের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক যে নিবিড় হতে পারে, তা হয়তো শুধুই হাতি মেরে সাথী সিনেমাটিতে ধরা পড়ে না। আর মানুষ এবং প্রাণীর মধ্যে নিবিড় সম্পর্কের নিদর্শন হয়তো দেওয়ার প্রয়োজনও পড়ে না। তবে, মানুষ-প্রাণীর মধ্যে যে এক নিবিড় সম্পর্ক গড়ে উঠতে পারে, সেই ধারণা, সেই প্রচলিত বিশ্বাস যেন কাঁচের মতোই টুকরো হয়ে যাবে ডুয়ার্সের মোরাঘাট রেঞ্জ লাগোয়া এলাকায় গেলে। কেন, নিশ্চয়ই মনে এই প্রশ্নই জেগেছে ? এই প্রশ্ন খুবই স্বাভাবিক। তবে উত্তরও মিলবে এখানেই। তাই উত্তর খুঁজতেই সময় কলকাতার প্রতিনিধি এক সন্ধ্যায় ঢু মেরেছিলেন মোরাঘাট রেঞ্জ লাগোয়া এলাকায়। তবে গিয়ে যা চাক্ষুস করলেন এবং শুনলেন, তাতে মনমরা হতে হয়।

কেন অকাল দীপাবলি পালন হচ্ছে ডুয়ার্সে?

গ্রামাঞ্চল। লেখা-পড়া সামান্য। জীবন-জীবিকাও সামান্য। কেউ যুক্ত কৃষিকাজের সঙ্গে, কেউ বা সামান্য বেতনের চাকরি করেন, কেউ হয়তো কর্মসূত্রে বাইরে, তবে পরিবারের বাকি সদস্যরা থাকেন গ্রামেই। কারোর হয়তো জঙ্গল লাগোয়া এই এলাকাতেই ছোট্ট ব্যবসা। ফলে গ্রামের প্রতিটি সংসারে অভাব-অনটন নেই, তা বলা ভুল। পরিবার চালাতে নিত্যদিনই কাজে বেরোতে হয় মানুষকে। তবে এই এলাকার জীবনযাত্রা খানিকটা অন্য। সারাদিন জীবন-জীবিকার যাতাকল থেকে বেরিয়ে রাতে স্বস্তির ঘুম ঘুমোতে পারেননা এই এলাকার মানুষেরা।

কেন, কারণ পাহারা দিতে হবে যে ! পাহারা না দিলে হয়তো ক্ষণিকের মধ্যেই সব ওলট-পালট হয়ে যেতে পারে। প্রতিনিয়ত মানুষগুলির মনে একটাই আতঙ্ক কাজ করে, এই বুঝি ঢুকে পড়ল বুনো হাতির দল! পালানোর পথ কোথায়, কেউ জানে না ! তাই বাঁচতে ৩৬৫ দিনই দীপাবলি পালন করা হয় গ্রামে। গ্রামের মানুষদের কথায়, সন্ধ্যা নামতেই জঙ্গল থেকে লোকালয়ে চলে আসে গজরাজ। আর তারপরেই লোকালয়ে কোথাও ফসল নষ্ট হচ্ছে, কোথাও ঘরবাড়ি ভাঙছে, কোথাও গজরাজের কোপ মানুষের প্রাণ যাচ্ছে। এর শেষ কোথায় কারোর জানা নেই। তাই দাঁতালদের দাপানি দমাতে গ্রামের প্রতিটি কোণায় আলো জ্বালিয়ে রাখেন তাঁরা। কোথাও টুনি বাল্ব, কোথাও মোমবাতি-লন্ঠন-কোথাও আবার মশালও জ্বলে। এ যেন দীপাবলি না আসতেই দীপাবলি পালন। তবে এই দীপাবলি খুশির নয়, এই দীপাবলি আতঙ্কের।

দেখলে মনে হবে যেন ভারত- বাংলাদেশ সীমান্তে রয়েছেন

গ্রামবাসীরা গোটা গ্রামটিকে যেন কোনও সীমান্তবর্তী এলাকার সেনা ছাউনি বানিয়ে ফেলেছেন। কয়েক মিটার পরপরই একটি সার্চলাইট নিয়ে নজরদারি করছেন মানুষ। প্রশ্ন করতে তাঁদের মুখে একটাই কথা, এই বুঝি দামালেরা ঢুকল গ্রামে। গ্রামের বিভিন্ন কোণে নজরে আসে ওয়াচ টাওয়ার। সেই টাওয়ারের নীচেই বেশ কয়েকজন মানুষকে বসে আড্ডা দিতেও দেখা যায়। রাত জেগে কী করছেন তাঁরা ? প্রশ্ন করতেই উত্তর মেলে, বাড়ির পুরুষেরা সন্ধ্যা নামতেই এই নজর মিনার গুলিতে হাতে একটি লাইট নিয়ে পাহারা দেন গজরাজের গতিবিধির ওপর নজর রাখার জন্য। তবে এই ওয়াচ টাওয়ার গুলিরও বেহাল অবস্থা, নিজে মুখে জানালেন তাঁরা।

নিরুপায় গ্রামবাসীরা

এগুলো শুধু মুখের কথা যে নয়, তার প্রমাণও চাক্ষুস করলেন সময় কলকাতার প্রতিনিধি। গ্রামের একপ্রান্তে ঢুকে পড়েছিল দাঁতালের দল। সেই তাণ্ডব থেকে বাঁচতে সার্চলাইট, শব্দবাজির ব্যবহার করে কোনওক্রমে বাঁচলেন গ্রামবাসীরা। এসবই তো হল গ্রামবাসীদের বাঁচার উপায়। প্রাণ হাতে নিয়ে, নিদ্রাহীন রাত কাটিয়ে কোনওক্রমে হয়তো গ্রাম বাঁচাতে পারছেন তাঁরা। তবে অরণ্যের প্রাণীদের চিন্তা কে করে ? তাদের বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে মানুষের বুদ্ধিমত্তার তুলনা হয়তো কোনও যুক্তিপূর্ণ তুলনা হবে না। তাই মনে প্রশ্ন আসে, যে এই আলো, মশাল, শব্দবাজি, বৈদ্যুতিক তারের মাধ্যে আলো জ্বালানো – এসবে তো বন্যপ্রাণীদেরও ক্ষতি হতে পারে ! তারও উত্তর দিলেন গ্রামবাসীরা।

কেন প্রতিনিয়ত হাতির তাণ্ডব বাড়ছে

গজরাজের পালের কী প্রকৃতঅর্থে কোনও দোষ থাকে? বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ এবং তাদের দেখাশোনা, তাদের নিজস্ব এলাকায় রাখার ক্ষেত্রে কি বনবিভাগ এবং জেলা প্রশাসনের কোনও দায়বদ্ধতা থাকে না ? স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, প্রশাসনিক আধিকারিকদেরও কি কোনও দায়বদ্ধতা থাকে না ? প্রশ্ন ওঠেই। অরণ্যের আয়তন হ্রাস, জঙ্গলে খাদ্যাভাব, জঙ্গল লাগোয়া এলাকায় বসতি স্থাপন ও চাষাবাদের জেরে বদলাচ্ছে ডুয়ার্সের হাতিদের খাদ্যাভ্যাস। ডুয়ার্সের বিভিন্ন এলাকায় হাতির দলের রান্নাঘর, ভাঁড়ার ঘর এবং জঙ্গল লাগোয়া স্কুলগুলিতে হানা দিয়ে সেখানে রাখা খাবার, রেশন ও মিড-ডে-মিলের চাল উদরসাৎ করা কিংবা গালামালের দোকান ভেঙে মুখরোচক খাবার খাওয়ার ঘটনা প্রায় নিয়মিত হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

পরিবেশকর্মীদের মতে, একটি পুর্ণবয়স্ক হাতির প্রতিদিন ১৫০-১৭০ কেজি খাবার এবং ৫০-৭০ লিটার জল প্রয়োজন। সেই পরিমাণ খাবার জঙ্গলে না মেলায় খাবারের খোঁজে তাদের লোকালয়ে আসতে হচ্ছে। এ সমস্যা মেটানো অত্যন্ত জরুরি। নইলে হাতি-মানুষের সংঘাত চলবেই।

 

About Post Author