Home » পাক -আফগান যুদ্ধ ও ভারতের অবস্থান

পাক -আফগান যুদ্ধ ও ভারতের অবস্থান

Oplus_131072

সময় কলকাতা ডেস্ক, ২৭ ফেব্রুয়ারি : আরেকটি আন্তর্জাতিক যুদ্ধের সূচনা। পাকিস্তান শুক্রবার আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা করেছে।বিবাদমান উভয় পক্ষের হানাহানিতে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গিয়েছে ইতিমধ্যেই।পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে সাম্প্রতিক উত্তেজনা এবং এতে ভারতের অবস্থানগত পরিস্থিতি কী?

পাকিস্তান-আফগানিস্তান যুদ্ধ পরিস্থিতি (২০২৬)

সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটেছে। বর্তমানে পরিস্থিতি একটি খোলা যুদ্ধে রূপ নিয়েছে।২০২৬ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ আফগানিস্তানের তালিবান সরকারের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধের ঘোষণা দেন । পাকিস্তান দাবি করছে, তালিবানরা পাকিস্তানি তালিবান (TTP) বিদ্রোহীদের আশ্রয় দিচ্ছে, যারা পাকিস্তানে হামলা চালাচ্ছে।পাক বাহিনী আফগানিস্তানের নানগারহার ও পাক্তিকা প্রদেশে বিমান হামলা চালিয়েছে, যাতে নারী ও শিশুসহ বহু বেসামরিক মানুষ হতাহত হয়েছে। কাবুলের দাবি অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় পাল্টাপাল্টি লড়াইয়ে অন্তত ৫৫ জন পাক সেনা নিহত হয়েছে। উল্লেখ্য, মূলত বিতর্কিত ডুরান্ড লাইন (সীমান্ত রেখা) এবং জঙ্গিবাদকে কেন্দ্র করেই এই সংঘাতের সূত্রপাত।

ডুরান্ড লাইন

ডুরান্ড লাইন হলো পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে ২৬৪০ কিলোমিটার (মতান্তরে ২৬৭০ কিমি) দীর্ঘ একটি আন্তর্জাতিক সীমান্তযা ১৮৯৩ সালে ব্রিটিশ কূটনীতিক স্যার মর্টিমার ডুরান্ড এবং আফগান আমির আব্দুর রহমান খানের মধ্যে চুক্তি অনুযায়ী নির্ধারিত হয় । এই রেখাটি পশতুন অধ্যুষিত এলাকাকে বিভক্ত করে এবং পাকিস্তান একে আন্তর্জাতিক সীমান্ত মনে করলেওআফগানিস্তান তা পুরোপুরি স্বীকৃতি দেয় না ।

ডুরান্ড লাইনের মূল বৈশিষ্ট্যসমূহ ও দুই দেশের বিরোধ :

এটি পশ্চিমের ইরান সীমান্ত থেকে পূর্বের চীন সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃতযা মূলত খাইবার পাখতুনখোয়াবেলুচিস্তান এবং উত্তর-পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে আফগানিস্তানকে বিভক্ত করে। ব্রিটিশরা তাদের ঔপনিবেশিক স্বার্থ রক্ষা এবং রুশ সাম্রাজ্যের বিস্তার রোধে আফগানিস্তানকে একটি বাফার রাষ্ট্র হিসেবে রাখতে এই সীমানা নির্ধারণ করেছিল। এই লাইনটি পশতুন গোত্রীয় এলাকাগুলোর মাঝখান দিয়ে যাওয়ায়এটি আফগানদের পরিবার এবং সংস্কৃতিকে বিভক্ত করেছে। আফগানিস্তান এটিকে ঐতিহাসিক কারণে অবৈধ মনে করে এবং এর বৈধতা প্রত্যাখ্যান করে আসছে।

দ্বন্দ্বের তথা যুদ্ধের বর্তমান অবস্থা:

পাকিস্তান সরকার নিরাপত্তা ও অবৈধ চলাচল রোধে এই সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করেছে যা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে।

গত ২৪ ঘন্টায় পাক ও আফগানের মধ্যে হানাহানিতে পাকিস্তানের দাবি অনুযায়ী, অন্তত ১৩০ জন তালিবান সেনা নিহত এবং আফগানিস্তানের দাবি অনুযায়ী – ৫৫ জন পাক সেনা নিহত হওয়া ছাড়াও সীমান্তবর্তী চারটি চেকপোস্ট থেকে পাকিস্তানি সেনারা পলায়ন করেছে।

পাক -আফগানিস্তান যুদ্ধ ও ভারতের ছায়া :

ভারত এই যুদ্ধে না থেকেও আছে।  পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী  খাজা আসিফের বক্তব্য এই যুদ্ধে ভারতের ছায়া সুস্পষ্ট থাকার বার্তাবাহী।খাজা আসিফ বলেছেন , “ন্যাটো বাহিনী প্রত্যাহারের পর, আফগানিস্তানে শান্তির প্রত্যাশা ছিল। তালিবানরা আফগান জনগণের উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার উপর মনোযোগ দিচ্ছে বলে মনে করা হয়েছিল । কিন্তু তালিবানরা আফগানিস্তানকে কার্যত ভারতের উপনিবেশে পরিণত করেছে । তারা সারা বিশ্ব থেকে সন্ত্রাসবাদীদের আফগানিস্তানে জড়ো করছে।সন্ত্রাসবাদকে রফতানি করাও শুরু করেছিল।” তিনি আরও উল্লেখ করেছেন, পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখার জন্য পাকিস্তান সরাসরি এবং বন্ধু দেশগুলির মাধ্যমে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়েছিল । তবে, তালিবানরা ভারতের মতো প্রতিশোধের মানসিকতাই দেখিয়েছে বলে দাবি পাক প্রতিরক্ষামন্ত্রীর।

 পাক প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর বক্তব্যের মধ্যে অন্যতম ইঙ্গিত পূর্ণ অংশ হল, পাক প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর  অভিযোগ অনুযায়ী আফগানিস্তান ভারতের উপনিবেশে পরিণত হয়েছে।

অন্যদিকে, পাক রাষ্ট্রপতি আসিফ আলি জারদারি বলেন, “পাকিস্তান শান্তি এবং আঞ্চলিক অখণ্ডতার সঙ্গে আপোস করবে না। আমাদের সশস্ত্র বাহিনী ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দিয়েছে । যারা আমাদের শান্তিকে দুর্বলতা মনে করে ভুল করে তাদের কঠোর জবাবের মুখোমুখি হতে হবে।”

পাশাপাশি পাক প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “আমাদের বাহিনী যে কোনও আক্রমণাত্মক প্রচেষ্টাকে চূর্ণ করতে সম্পূর্ণরূপে সক্ষম । প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে কোনও আপোস করা হবে না।প্রতিটি আগ্রাসনের উপযুক্ত জবাব দেওয়া হবে।”

 পাক-আফগানিস্তান দ্বন্দ্ব ও যুদ্ধ নিয়ে ভারতের বক্তব্য :

ভারত এই সংঘাতে সরাসরি জড়িত না হলেও আফগানিস্তানের সার্বভৌমত্বের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে এবং পাকিস্তানের সামরিক পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা করেছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (MEA) পাকিস্তানের বিমান হামলায় বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ার ঘটনার কড়া সমালোচনা করেছে । ভারতের মতে, এটি পাকিস্তানের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ ব্যর্থতাগুলো আড়াল করার একটি চেষ্টা। ভারত ঐতিহাসিকভাবে আফগানিস্তানের সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার পক্ষে । তালিবান শাসিত আফগানিস্তানের সাথে ভারতের বাড়তে থাকা সুসম্পর্ক নিয়ে ইসলামাবাদ দীর্ঘদিনের উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে।

ভারত অতীতে আফগানিস্তানের বৃহত্তম আঞ্চলিক সাহায্য প্রদানকারী দেশ ছিল এবং বর্তমানেও আফগান জনগণের প্রতি মানবিক সমর্থন বজায় রেখেছে।

ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের প্রেক্ষাপট

পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়েন দীর্ঘদিনের। কাশ্মীর ইস্যু এবং জঙ্গিবাদ নিয়ে দেশ দুটির মধ্যে একাধিক বড় যুদ্ধ (১৯৪৭, ১৯৬৫, ১৯৭১, ১৯৯৯) হয়েছে । অতি সম্প্রতি ২০২৫ সালের মে মাসে অপারেশন সিন্দুর-এর মাধ্যমে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে একটি সংক্ষিপ্ত সশস্ত্র সংঘাত ঘটেছিল। বর্তমান পাকিস্তান-আফগানিস্তান সংঘাতের ফলে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের কৌশলগত গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে।।

পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে সাম্প্রতিক রক্তক্ষয়ী সীমান্ত সংঘর্ষ গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে তীব্র উত্তেজনার বহিঃপ্রকাশ এবং এটি ইতোমধ্যেই ভঙ্গুর অঞ্চলের পরিস্থিতিকে আরো সংবেদনশীল স্তরে নিয়ে গিয়েছে। পাকিস্তানের হামলা পর্যবেক্ষকদের বিস্মিত করেছে এবং প্রতিবেশী দেশের প্রতি পাকিস্তানের বিপজ্জনক এক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। যদিও সীমান্ত উত্তেজনা নতুন নয়, তবে এবার আফগান ভূখণ্ডের অভ্যন্তরে বিশেষ করে, কাবুল ও তার আশেপাশের এলাকায় হামলা হয়েছে। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের তরফে করা বক্তব্য অনুযায়ী ভারতের আফগানিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক পাক আফগান সম্পর্কে ভারতের ছায়ার উল্লেখ এবং পাক আফগান দ্বন্দ্বে ভারতের কৌশলগত অবস্থান এই যুদ্ধ ঘিরে উপমহাদেশের অস্থিরতায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে বলাইবাহুল্য।।

About Post Author