পুরন্দর চক্রবর্তী, সময় কলকাতা, ১৫ অগাস্ট, ২০২৬: আজ ১৫আগস্ট, ভারতের স্বাধীনতা দিবস। অনেক রক্ত এবং সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে পাওয়া স্বাধীনতা যা ভারতের মানুষ উদযাপন করে চলেছে। স্বাধীনতা দিবস উদযাপন করছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। তবুও বিতর্ক যেন পিছু ছাড়ে না। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম নিয়ে আলোচনায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের স্বাধীনতা লাভের ক্ষেত্রে ভূমিকা নিয়ে চায়ের কাপে তুফান ওঠে। আজকে স্বাধীন ভারতের রাজনৈতিক দলগুলির প্রভাব রয়েছে তাদের মধ্যে স্বাধীনতা সংগ্রামের অবদানের ক্ষেত্রে জাতীয় কংগ্রেসকে নিয়ে বিতর্কের অবকাশ নেই। একমাত্র দেশভাগ এবং দেশ বিভাজন তত্ত্বের পর্যালোচনা ছাড়া কোথাও কোনও বিতর্ক নেই কংগ্রেসের অবদান নিয়ে। কংগ্রেসের পাশাপাশি ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে এবং ভারতের স্বাধীনতায় কমিউনিস্ট পার্টির এবং হিন্দুত্ববাদী দলগুলির অবদান নিয়ে মাঝেমধ্যেই বিতর্ক ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। একদিকে আজকের সিপিআই বা সিপিআইএম, ফরওয়ার্ড ব্লক বা অন্যদিকে হিন্দুত্ববাদী বা ভারতীয় জনতা পার্টির কী অবদান রয়েছে তা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক চলতে থাকে। ভারতের স্বাধীনতা দিবস উদযাপন নিয়ে কমিউনিস্ট পার্টির ভাবধারা নিয়েও বিতর্ক চলে । বাস্তবতা এই যে, ইতিহাসের দিকে তাকালে এবং ইতিহাসের পাতা খুললে আদতে বিতর্ক দানা বাঁধতে পারে না । প্রকাশিত হয় ঐতিহাসিক সত্য। যুক্তি এবং নথির ভিত্তিতে ইতিহাস কী বলে, স্বাধীনতা সংগ্রামে রাজনৈতিক দলগুলির অবদান এবং উদযাপন কেন্দ্রিক ইতিহাস তুলে ধরার চেষ্টা করা হলো এই প্রতিবেদনে।
বলাই বাহুল্য, ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম নিয়ে আলোচনায় রাজনৈতিক দলের ভূমিকার ক্ষেত্রে প্রথমেই উচ্চারিত হয় জাতীয় কংগ্রেসের নাম। ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত কংগ্রেস দলের ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে জাতীয় কংগ্রেস এবং কংগ্রেসের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত স্বাধীনতা সংগ্রামীদের অবদান ছিল অপরিসীম। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামকে মূলত তিনটি পর্যায়ে ভাগ করে নেওয়া যায় যার নেতৃত্বে ছিল কংগ্রেস । স্বাধীনতা সংগ্রামে কংগ্রেসের নরমপন্থী পর্বর মেয়াদ ১৮৮৫ থেকে ১৯০৫ সাল পর্যন্ত ধরা হয়। প্রথম দিকে সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ও গোপালকৃষ্ণ গোখলের মতো নেতারা ব্রিটিশ সরকারের কাছে যুক্তি এবং আবেদনের মাধ্যমে ভারতীয়দের অধিকার আদায়ের চেষ্টা করেন। তবে ১৯৪৭ সাল পর্যন্তই নরমপন্থী নেতারা বিভিন্নভাবে অহিংসা আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে ভারতের স্বাধীনতার লড়াই চালিয়ে গিয়েছেন। কংগ্রেসের চরমপন্থী পর্ব মূলত ১৯০৫ থেকে ১৯১৯ সাল পর্যন্ত ধরা হলেও স্বাধীনতা লাভ পর্যন্ত কংগ্রেসের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যোগসূত্র রাখা সহিংস বিপ্লবীদের অবদানও অনস্বীকার্য। সহিংস আন্দোলনের সূচনা পর্বে লালা লাজপত রায়, বাল গঙ্গাধর তিলক এবং বিপিনচন্দ্র পাল (লাল-বাল-পাল) ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন ও বয়কটের ডাক দেন। ১৯১৯ থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে কংগ্রেস কর্মসূচি একটি গণ-আন্দোলনে পরিণত হয়। অসহযোগ, আইন অমান্য এবং ভারত ছাড়ো আন্দোলনের মাধ্যমে ব্রিটিশ শক্তির ভিত নড়ে যায়।
কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত স্বাধীনতা সংগ্রামীদের ইতিহাস স্বর্ণাক্ষরে লিখিত। কংগ্রেসের নেতাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের মধ্যে গৌরবের সঙ্গে লেখা রয়েছে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর নামও । নেতাজী সুভাষচন্দ্র পরবর্তীতে কংগ্রেস ত্যাগ করতে বাধ্য হন এবং নেতাজি সুভাষ চন্দ্রের ১৯৩৯ সালে ফরোয়ার্ড ব্লকের গঠন এবং আজাদ হিন্দ ফৌজের কর্মকাণ্ডের প্রভাব ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে অপরিসীম। নেতাজী সুভাষ ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে একটি অসামান্য এবং স্বতন্ত্র অধ্যায়। এই প্রসঙ্গে পাশাপাশি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য রাসবিহারী বসুর অবদান।
সবমিলিয়ে, কংগ্রেসের জন্ম লগ্ন থেকে উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় দাদাভাই নওরোজি থেকে শুরু করে নেতাজি, নেহেরু ,গান্ধী বা খান আব্দুল গফফার খান প্রত্যেকের ভূমিকা ও প্রভাব ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে অপরিসীম।
বর্তমানে বিজেপি শাসিত ভারত বর্ষ। বিজেপি ভারতের স্বাধীনতা দিবসের মূল্যকে গুরুত্বের সঙ্গেই বরাবর বিচার করেছে। অত্যন্ত ঘটা করেই বিজেপি ও কেন্দ্রীয় সরকার ভারতের স্বাধীনতা দিবস উদযাপন করছে যা নিয়ে প্রতিটি ভারতীয় গর্ববোধ করবে এটাই স্বাভাবিক।তবে বিজেপির সরাসরি ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম পর্বে যোগাযোগ থাকার কোন সম্ভাবনা নেই বা ছিল না ।উল্লেখ্য, বিজেপির সৃষ্টি হয় স্বাধীনতার ৩৩বছর পরে অর্থাৎ ১৯৮০ সালে। বর্তমান ভারতীয় জনতা পার্টি যাদের ভাবধারা অনুসরণ করে অর্থাৎ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে গঠিত ভারতীয় জনসংঘর জন্মলগ্ন ১৯৫১ সালে অর্থাৎ স্বাধীনতার চার বছর পরে। যদি বিজেপির মূল ভাবধারার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে তার ও আগের ইতিহাসে যদি ফিরে তাকানো যায় তবে দেখা যাবে ১৯১৫ সালে হরিদ্বারে কুম্ভমেলা চলাকালীন মদন মোহন মালব্য ও অন্যান্যদের উদ্যোগে হিন্দু মহাসভা গঠিত হয়েছিল । বর্তমান ভারতবর্ষে রাজনৈতিক এবং সামাজিক ক্ষেত্রে যে দলের যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে সেই রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ বা আরএসএস ১৯২৫ সালের ২৭শে সেপ্টেম্বরে প্রতিষ্ঠিত হয়, নাগপুরে কেশব বলিরাম হেডগেওয়ার এর প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু সরাসরি বিজেপির ভাবধারার সঙ্গে সাযুজ্য যুক্ত প্রথম রাজনৈতিক দল ছিল ভারতীয় জনসংঘ। এবার আসা যাক হিন্দু মহাসভা বা রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘের ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে অবদানের প্রসঙ্গে।
ইতিহাস বলে, ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (RSS) এবং অল ইন্ডিয়া হিন্দু মহাসভা প্রাতিষ্ঠানিক বা সাংগঠনিকভাবে সরাসরি কোনো বড় অবদান রাখেনি। ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক গবেষকদের মতে, এই সংগঠন দুটি ব্রিটিশ বিরোধী প্রধান জাতীয় আন্দোলনগুলো (যেমন- অসহযোগ আন্দোলন, ভারত ছাড় আন্দোলন) থেকে দূরে ছিল এবং নিজেদের হিন্দুত্ববাদী ও সাংস্কৃতিক সংগঠনে সীমাবদ্ধ রেখেছিল। ১৯৪২ সালের মহাত্মা গান্ধীর ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের তীব্র বিরোধিতা করে হিন্দু মহাসভা। অন্যদিকে, স্বাধীনতা সংগ্রামে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) ভূমিকা প্রত্যক্ষ ছিল না। ১৯২৫ সালে কেশব বলিরাম হেডগেওয়ার কর্তৃক গঠিত আরএসএস কোনো ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশ নেয়নি।রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের লক্ষ্য ছিল হিন্দু সমাজের ঐক্য ও সংগঠন তৈরি করা এবং ভারতীয় সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ রক্ষা করা। তাদের গৃহীত পথ ছিল শারীরিক ও মানসিক শৃঙ্খলার মাধ্যমে চরিত্র গঠন করে দেশসেবা ও জাতীয় চেতনার বিকাশ ঘটানো।পরাধীন ভারতে স্বাধীনতা সংগ্রামে বা মহাত্মা গান্ধীর আন্দোলনে সংঘটিতভাবে অংশ নেওয়া থেকে বিরত ছিল।ঔপনিবেশিক শাসনকালে ব্রিটিশ শক্তির বিরুদ্ধে সরাসরি কোনো রাজনৈতিক বা সশস্ত্র সংগ্রামে নামেনি। তবে হিন্দু মহাসভা সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সাভারকার একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ নাম যা গুরুত্বপূর্ণ এবং বিতর্কিত। ইতিহাস কী বলে?
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে সাভারকারের কর্মকাণ্ডকে দুটি ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথমত তাঁর হাত ধরে ১৮৯৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় মিত্রমেলা এবং ১৯০৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় অভিনব ভারত। সাভারকার গোপনে অস্ত্র যোগাড় করতেন এবং ভারতীয় যুবকদের সশস্ত্র বিপ্লবের পাঠ দিতেন ।ভারতীয় যুবকদের বিদেশি পণ্য বর্জন ও দেশীয় পণ্য ব্যবহারের বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করেন। পাশাপাশি গোপনে, প্রথমে দেশে এবং পরে ইউরোপে গিয়ে লন্ডনের ইন্ডিয়া হাউস থেকে বিপ্লবের মন্ত্র ছড়াতে শুরু করেন। লণ্ডনে অবস্থানকালে তিনি ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহকে নিছক ‘সৈনিক বিদ্রোহ’ না বলে তাকে ভারতের ‘প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ’ হিসেবে আখ্যায়িত করে একটি বই লেখেন। এই বইটি পরবর্তী সময়ে অনেক ভারতীয় বিপ্লবীকে অনুপ্রাণিত করেছিল। ব্রিটিশ সরকার তাঁকে তাঁর বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ডের জন্য গ্রেফতার করে ব্রিটিশ আদালত তাঁকে দুটি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়ে আন্দামানের কুখ্যাত সেলুলার জেলে পাঠায়। কারাবাসের সময় তিনি ব্রিটিশ সরকারের কাছে একাধিকবার ক্ষমা প্রার্থনা ও মুচলেকা দিয়ে ১৯২৪ সালে শর্ত সাপেক্ষে মুক্তি পান এবং রত্নগিরিতে নজরবন্দী থাকেন। ১৯৩৭ সালে সম্পূর্ণরূপে মুক্তি পেয়ে তিনি প্রধানত হিন্দুত্ববাদী মতবাদ প্রচারে নিযুক্ত থাকেন। ব্রিটিশ সরকারের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা ও রত্নগিরিতে থাকাকালীন সময়কাল থেকে ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে সরাসরি সশস্ত্র আন্দোলন থেকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সরে আসাকে ভারতীয় ইতিহাসের একটি বিতর্কিত দিক হিসেবে দেখা হয়। তবে কয়েকজন নেতাকে স্বাধীনতা পূর্ববর্তী সময়ে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণ করতে দেখা গিয়েছে বা সেই ইতিহাস নথিবদ্ধ আছে। ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ী ছাত্রাবস্থায় ১৯৪২ সালের ভারত ছাড়ো আন্দোলনে যুক্ত হয়েছিলেন এবং সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য গ্রেফতার ও হয়েছিলেন। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময় বাংলা ও পাঞ্জাব বিভাজনের বিরুদ্ধে এবং বঙ্গপ্রদেশের হিন্দুপ্রধান অংশকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষেত্রে প্রভাবশালী রাজনৈতিক ভূমিকা পালন করেছিলেন। পরাধীন ভারতের দেশাত্মবোধক কর্মকাণ্ডে আরেকটি উল্লেখযোগ্য নাম হেডগেওয়ার। তিনি ছাত্র জীবনে গুপ্ত সমিতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তবে পরবর্তীতে দেশাত্মবোধক হিন্দুত্ববাদী আদর্শের রূপকার হয়ে ওঠেন। একই বিষয় লক্ষ্য করা গিয়েছে জনসংঘ বা বিজেপির সঙ্গে যুক্ত নেতাদের ক্ষেত্রে। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ বা হিন্দু মহাসভার সদস্য ছিলেন অধিকাংশ প্রবীণ রাজনৈতিক নেতা। যে সময় স্বাধীনতা সংগ্রামে উত্তাল হয়ে উঠেছিল দেশ সেসময় তাঁদের দু-একটি বিক্ষিপ্ত উদাহরণ ছাড়া তাঁদের প্রত্যক্ষ সংগ্রামে যুক্ত হওয়ার ইতিহাস নেই। দীনদয়াল উপাধ্যায়ের মতো স্মরণীয় নেতাদের অবদান ছিল ভারতের সাংস্কৃতিক পরিচয় পুনরুদ্ধার এবং দেশীয় মূল্যবোধের ভিত্তিতে সমাজ গঠন করা।
এবার আসা যাক কমিউনিস্ট দলগুলির কথায়। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে বর্তমানে বাম দলগুলির অতীতের ইতিহাস কী ? ভারতে কমিউনিস্টদের ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রাম ও আন্দোলনের কথা বলতে হলে তাদের গোড়ার কথা বলতে হয়। তাসখন্দে ১৯২০ সালে জন্মলগ্ন এবং ১৯২৫ সালে ভারতে পার্টির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন কালে তাদের পার্টি লাইন তুলে ধরা দরকার। উল্লেখ্য, মানবেন্দ্রনাথ রায় (এম. এন. রায়), অবনী মুখার্জি ও অন্যান্য বিপ্লবীরা সোভিয়েত ইউনিয়নের তাসখন্দে প্রথম কমিউনিস্ট পার্টি গঠন করেন। ভারতের ভেতরে বিভিন্ন মার্কসবাদী ও মার্কসবাদী ও বামপন্থী দলগুলোকে একত্রিত করে ১৯২৫ সালের ২৬শে ডিসেম্বর কানপুরে এক সর্বভারতীয় সম্মেলনের মাধ্যমে পার্টিটি আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করে । ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান ঘটিয়ে পূর্ণ স্বাধীনতা অর্জন, শ্রমিক ও কৃষকদের অধিকার রক্ষা এবং সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠন করাই ছিল এই পার্টি প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্য। স্বাধীনতা দিবস উদযাপনে তাদের নিয়ে বিতর্কের সত্যি কি কোন স্থান রয়েছে? ভারতের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে বর্তমান কমিউনিস্ট ভাবধারার আন্দোলনে বহুল প্রচলিত “ইয়ে আজাদী ঝুটা হ্যায় ” সংক্রান্ত স্লোগান ও তত্ত্বটি বারবার বিতর্কের জন্ম দেয় অনেকের কাছে। তবে স্বাধীনতার পর থেকেই কমিউনিস্টদের চলে আসা এই স্লোগানের পরবর্তী অংশটি ছিল ” মকান বদলা হ্যায়, ইনসান নেহি “। কমিউনিস্টরা ভারতের স্বাধীনতাকে সর্বাঙ্গীন স্বাধীনতা মনে করেনি তার ব্যাখ্যা পার্টির দৃষ্টিকোণ থেকে বারবার উল্লেখ করা হয়েছে। ভারতের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে ব্রিটিশদের সাথে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের সমঝোতাকে তারা শ্রমিক-কৃষকের প্রকৃত মুক্তি বলে মনে করেনি। ধর্মের ভিত্তিতে ভারত বিভাজন ও তার ফলে সৃষ্ট ভয়াবহ দাঙ্গা ও বাস্তুচ্যুতি তাদের হতাশ করেছিল। সরকারিভাবে উদযাপিত মূল আনন্দানুষ্ঠান থেকে তারা নিজেদের দূরে সরিয়ে রেখেছিল এবং একে স্বাগত জানায়নি। স্বাধীনতা দিবসে বামপন্থী ( যেমন সিপিআইএম) পার্টি অফিস থেকে জাতীয় পতাকা উত্তোলিত হতো না। তাদের পার্টি লাইন মেনে নতুনভাবে নেওয়া সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অবশেষে তারা ২০২১ সাল থেকে স্বাধীনতা দিবস উদযাপনের সিদ্ধান্ত নেয়। ২০২১ সাল থেকে জাতীয় পতাকা বিভিন্ন সিপিএমের পার্টি অফিসে উত্তোলন করা শুরু হতে থাকে। প্রাসঙ্গিকভাবে ভারতের স্বাধীনতায় কমিউনিস্টদের অবদান নিয়ে প্রশ্নচিহ্ন থাকতে পারেনা। সন্দেহও নেই ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে তাদের লক্ষ্য উদ্দেশ্য এবং অবদান নিয়ে। এই পার্টি প্রতিষ্ঠার অন্যতম মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতা এবং ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শোষণ ও সাম্রাজ্যবাদী শাসনের কবল থেকে ভারতকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত করা। পাশাপাশি লক্ষ্য ছিল দেশের খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের স্বার্থরক্ষা ও সম বন্টন যুক্ত সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা। জন্ম লগ্ন থেকেই তারা ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে নিজেদের আত্ম নিয়োজিত করে।১৯২৯ সালের বিখ্যাত ‘মিরাট ষড়যন্ত্র মামলা’-র মাধ্যমে ব্রিটিশ সরকার বহু কমিউনিস্ট নেতাকে বন্দি করে, যা ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে তাদের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের প্রমাণ দেয়। স্বাধীনতার প্রাক লগ্নে একাধিক আন্দোলন স্বাধীনতা সংগ্রামের নথিবদ্ধ প্রমাণ হিসাবে আজও ইতিহাসে স্বীকৃত। পরবর্তী দুই দশকে একাধিক ক্ষেত্রে তারা সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের গুরুতর বিরোধিতা করেন এবং অনেকে সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্যেও নিজেদের আত্মনিয়োগ করেন। এক্ষেত্রে ভগৎ সিং থেকে শুরু করে গণেশ ঘোষ নামের তালিকা অসংখ্য এবং অগণন। অসংখ্য উল্লেখযোগ্য বামপন্থী আন্দোলনের মধ্যে কমিউনিস্ট আন্দোলনের দু একটি উদাহরণের দিকে দিকে চোখ রাখলে বিষয়টি বোঝা যাবে। তারা ১৯৪৬ সালে কেরালার পুন্নাপ্রা-ভায়ালার এবং অন্ধ্রপ্রদেশের তেলেঙ্গানায় সামন্তবাদী শাসন ও নিজামের বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী সশস্ত্র কৃষক গেরিলা সংগ্রাম পরিচালনা করে।বোম্বাইয়ে ঐতিহাসিক নৌসেনা বিদ্রোহের (রয়েল ইন্ডিয়ান নেভি মিউটিনি) সময় কমিউনিস্টরা সরাসরি সাধারণ শ্রমিক ধর্মঘট ডেকে সংহতি ও নেতৃত্ব প্রদান করেছিল। কমিউননিস্ট ভাবধারায় আন্দোলন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে একটি বিরাট প্রভাবশালী অধ্যায় একথা অস্বীকার করার জায়গা নেই। ইতিহাস অন্তত তেমনটাই বলে।
বাস্তব হল, ইতিহাস বলে যে কংগ্রেসের পাশাপাশি কমিউনিস্ট দলগুলি বা ফরওয়ার্ড ব্লক ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে সুদূরপ্রসারী প্রভাব রেখেছে। নিঃসন্দেহে নরমপন্থী এবং চরমপন্থী ভাবধারায় কংগ্রেস জন্ম লগ্ন থেকে ১৯৪৭ সালের ১৫ ই আগস্ট পর্যন্ত স্বাধীনতার সংগ্রামের ইতিহাসের প্রাণকেন্দ্রে থেকেছে । বামপন্থী তথা কমিউনিস্টরাও উপনিবেশিক ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তির পতন ঘটাতে চেয়েছে, বিভিন্ন চরমপন্থী আন্দোলনের অংশ হয়ে উঠেছেন কমিউনিস্টরা। পাশাপাশি, তৎকালীন হিন্দু মহাসভা বা রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের লক্ষ্য ছিল ভারতীয় সংস্কৃতি ও মূল্যবোধকে ধরে রেখে হিন্দু সমাজের ঐক্য গঠন করা এবং জাতীয় সচেতনতার বিকাশ ঘটানো।।
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম #স্বাধীনভারত


More Stories
মেঘভাঙা বৃষ্টি ও হড়পা বানে উত্তরাখণ্ডে ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়
শহীদ দিবসে স্মরণ : “ক্ষুদিরাম নিচে অদৃশ্য হইয়া গেল”
অজ্ঞাত উড়ন্ত বস্তু নিয়ে মার্কিন ফাইল জোরালো করেছে ভিনগ্রহীদের সম্ভাবনা