পুরন্দর চক্রবর্তী,সময় কলকাতা , ১৮ জানুয়ারি : উত্তরপ্রদেশে গ্রামের ভোটারের চেয়ে রাজ্যের মোট ভোটার কম! এরকমই হয়েছে এসআইআরের কৃপায়! শহরের ভোটাররা তাহ’লে গেল কোথায়? সুপ্রিম কোর্টে উত্তরপ্রদেশে এসআইআর-এর পরস্পর বিরোধী ও আশ্চর্য তথ্যের ভিত্তিতে জমা পড়েছে আবেদন।
আজব কাণ্ড বললে কম বলা হয়। শুনলে অনেকেরই চোখ ছানাবড়া হয়ে যাবে। অনেকেই হয়তো জানেন না, উত্তরপ্রদেশে একইসঙ্গে চলছে দুটি ভোটার সংশোধনী প্রক্রিয়া বা এসআইআর (SIR)। একটি এসআইআরে রাজ্যের সমস্ত ভোটারের প্রাথমিক খসড়া তালিকা তৈরি হয়েছে,অন্যটিতে পঞ্চায়েত ভোটের জন্য গ্রামের বা রুরাল ভোটার তালিকা প্রস্তুত হয়েছে। বিস্ময়করভাবে উত্তরপ্রদেশ রাজ্যের মোট ভোটার সংখ্যার চেয়ে গ্রামের ভোটার বেশি এমনটাই দুটি তালিকায় প্রকাশ পেয়েছে। পঞ্চায়েতের ভোটার তালিকায় ভোটার সংখ্যা রাজ্যের ভোটারের চেয়ে ১৩ লক্ষ বেশি। এনিয়ে সুপ্রিম কোর্টে মামলা রুজু হয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট নির্বাচন কমিশনকে অবিশ্বাস্য এই অসংগতি খতিয়ে দেখতে নির্দেশ দিয়েছে।
উত্তর প্রদেশের এসআইআর কাণ্ড ও উত্তর প্রদেশের এসআইআর-এর দুটি তালিকা সর্বকালের সব ধরনের নির্বাচনী অসংগতির অভিযোগকে পেছনে ফেলে দিয়েছে। প্রসঙ্গত, একদিকে ভারতের নির্বাচন কমিশন উত্তর প্রদেশের বিধানসভা ভোটের জন্য এসআইআর বা বিশেষ নিবিড় সংশোধন পদ্ধতিতে ভোটার তালিকা প্রস্তুত করছে। অন্যদিকে, উত্তর প্রদেশের রাজ্য নির্বাচন কমিশন পঞ্চায়েত ভোটের ভোটার তালিকা প্রস্তুত করছে। আর দুটি তালিকার খসড়া সামনে আসতেই হইচই পড়ে গেছে কারণ রাজ্যের ভোটার সংখ্যার চেয়ে গ্রামের ভোটার সংখ্যা বেশি এমন আশ্চর্য সংখ্যাতত্ত্ব প্রকাশ পেয়েছে। আর এই আশ্চর্য অসংগতি ও গরমিলের অভিযোগ নিয়ে বারাবঙ্কির সাংসদ তনুজ পুনিয়া সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হন। সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি সূর্যকান্ত ও জয়মাল্য বাগচীর ডিভিশন বেঞ্চে এই আশ্চর্য তথ্য সম্বলিত নোট জমা পড়ে।
কী অসংগতি ধরা পড়েছে উত্তরপ্রদেশে পঞ্চায়েত এবং বিধানসভা নির্বাচনের জন্য আলাদা আলাদা ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (SIR) বা বিশেষ ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ার তালিকায়? বিধানসভা নির্বাচনের ভোটার তালিকা সংশোধন করে ভারতীয় নির্বাচন কমিশন (ECI), আর পঞ্চায়েত ও স্থানীয় নির্বাচনের জন্য তালিকা তৈরি করে উত্তরপ্রদেশ রাজ্য নির্বাচন কমিশন (SEC) ২০২৬ সালের ১৫ জানুয়ারি সুপ্রিম কোর্টে জমা হওয়া নোট অনুযায়ী দুটির বিশাল ফারাক এবং যুক্তিহীন অসংগতি। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বিধানসভা সংশোধনের (SIR) পর উত্তরপ্রদেশে মোট ভোটার সংখ্যা হয়েছে ১২কোটি ৫৬ লক্ষ। অন্যদিকে, পঞ্চায়েত সংশোধনের পর শুধুমাত্র গ্রামীণ ভোটারের সংখ্যাই দাঁড়িয়েছে ১২ কোটি ৬৯ লক্ষ। তথ্য অনুযায়ী, পঞ্চায়েতে ৪০ লক্ষ ভোটারের নাম নতুন করে যোগ হয়েছে। বিগত পঞ্চায়েত ভোটারের চেয়ে ভোটার সংখ্যা বেড়ে গেছে। অন্যদিকে, ভারতের নির্বাচন কমিশনের তালিকায় উত্তরপ্রদেশের ভোটার অস্বাভাবিকভাবে কমেছে। ‘বৈধ’ ভোটারের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২ কোটি ৫৫ লক্ষ ৫৬ হাজার ২৫ জন যা ২০২৫-এর অক্টোবরে ছিল প্রায় ১৫ কোটি ৪৪ লক্ষ । খসড়া তালিকা থেকে বাদ গিয়েছে ২.৮৯ কোটি ভোটার। বাদ পড়া ভোটারদের মধ্যে ২.১৭ কোটি স্থানান্তরিত। অন্যদিকে ৪৬.২৩ লক্ষ মৃত ভোটার এছাড়াও ২৫.১৭ লক্ষ এমন ভোটারের নাম বাদ পড়েছে, যাঁদের একাধিক স্থানের ভোটার তালিকায় নাম রয়েছে। ফলে, উত্তরপ্রদেশের ভোটার তালিকায় এতদিন ভয়ংকর ভাবে ভূতেরা বাস করছিল এমনটাই সামনে এসেছে। তবে সবকিছু ছাপিয়ে গিয়েছে গ্রামের ভোটার সংখ্যা চেয়ে সারা রাজ্যের ভোটার সংখ্যা কম হওয়ার বুদ্ধি-যুক্তি অগম্য, তথ্য।
বাস্তবে,এসআইআরের দুই তালিকার মধ্যে ভোটার সংখ্যার বিপুল পার্থক্য (প্রায় ৪ কোটি ভোটারের অমিল) ধরা পড়েছে। আর এই অসঙ্গতি সম্বলিত নোট নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন জমা করেন আইনজীবী সুলমান খুরশিদ এবং আইনজীবী সারিক আহমেদ। তাঁদের বক্তব্য, এই দুটি অসঙ্গতিপূর্ণ তালিকা একসঙ্গে থাকতে পারে না।আদালত নির্বাচন কমিশনকে এই অসঙ্গতি তদন্ত করে দেখার নির্দেশ দিয়েছে।
উল্লেখ্য, ভারতীয় নির্বাচন কমিশনের এসআইআর (SIR) প্রক্রিয়ায় ভোটার যাচাইয়ের জন্য নথিপত্র সংগ্রহ এবং শুনানি হয়েছে, যা উত্তরপ্রদেশে প্রায় ৬২ দিন ধরে চলেছিল। উত্তরপ্রদেশ ভারতের সেই অল্প কয়েকটি রাজ্যের মধ্যে একটি (অন্যান্য রাজ্য যেমন উত্তরাখণ্ড, ওড়িশা, আসাম ইত্যাদি) যারা স্থানীয় নির্বাচনের জন্য নিজেদের ভোটার তালিকা প্রস্তুত করে। উত্তরপ্রদেশের শাসক দল এবং কেন্দ্রের ক্ষমতাসীন অন্যতম প্রধান দল বিজেপির মুশকিল হয়েছে যে, তারা এসআইআর একটি নির্ভুল গণনা পদ্ধতি এমনটাই দাবি করে গলা ফাটাচ্ছিল, অথচ বিজেপি শাসিত রাজ্যে এসআইআরের তালিকায় চরম অসংগতি ধরা পড়েছে এবং বিষয়টি নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত হস্তক্ষেপ করেছে।
আরও পড়ুনসাংবাদিক নিগ্রহ : কেন বারবার আক্রমণ? দায় কার?


More Stories
ভোটের আগে এসআইআর নিয়ে ঐতিহাসিক সুপ্রিম রায়
পাথরের দেবতাকে পুজো না করে জীবন্ত দেবতা মোদি ও যোগীকে পুজো করার নিদান বিজেপি বিধায়কের
ডিটেনশন ক্যাম্পে না যেতে চেয়ে ৬ জনের স্বেচ্ছামৃত্যুর আবেদন