Home » শান্তি নেই শ্মশানেও -বঙ্গভূমির করুণ আখ্যান

শান্তি নেই শ্মশানেও -বঙ্গভূমির করুণ আখ্যান

সানি রায়, সময় কলকাতা, ৫ জুন :  শান্তি নেই শ্মশানেও । এও আমাদের বঙ্গভূমি এবং এখানে রয়েছে বঙ্গভূমির এক করুণ আখ্যান । মাইকেল মধুসূদন দত্ত “বঙ্গভূমির প্রতি ” কবিতায় লিখেছিলেন ‘জন্মিলে মরিতে হবে, অমর কে কোথা কবে’। সৃষ্টির এই চিরন্তন সত্য মেনে মানুষ বিদায় নেয় ঠিকই, কিন্তু মৃত্যুর পরও যদি জোটেনা ন্যূনতম সম্মান, তবে তার চেয়ে বড় ট্র্যাজেডি আর কী হতে পারে!

জলপাইগুড়ি জেলার ধূপগুড়ি ব্লকের ঝাড় আলতা ২ নং গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রাণকেন্দ্র খট্টিমারি গ্রামের গল্পটা ঠিক তেমনই। স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত এই গ্রামের মানুষের ভাগ্যে জোটেনি একটি স্থায়ী শ্মশানঘাট। প্রিয়জনকে হারানোর যন্ত্রণার মাঝেই এখানে শুরু হয় শেষকৃত্যের জন্য নিজস্ব বাড়ির পাশে পড়ে থাকা জমি আর নয়তো গোটা গ্রামের উপর দিয়ে বয়ে চলা গিলান্ডি নদী ও নানাই নদীর একমাত্র চর। গ্রামে একটা শ্মশান নির্মাণ নিয়ে বামফ্রন্ট, তৃণমূল কিংবা বর্তমানে রাজ্যের ক্ষমতাশীল দল বিজেপি রাজনৈতিক দলগুলোর রঙ বদলালেও, নেতা-মন্ত্রী থেকে শুরু করে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের আচরণে নুন্যতম সৌজন্য বা সদিচ্ছার দেখা মেলেনি।গ্রাম পঞ্চায়েতের একেবারে প্রান্তিক এলাকা উত্তর খট্টিমারি, মধ্য খট্টিমারি ও দক্ষিণ খট্টিমারি। এমনকি পার্শ্ববর্তী ঝাড় আলতা ১নং এবং মাগুরমারী গ্রাম পঞ্চায়েতের হাজার হাজার মানুষেরও একমাত্র ভরসা গ্রামের বুক চিরে বয়ে চলা গিলান্ডি ও নানাই নদী। এই গোটা অঞ্চলের মানুষের মৃত্যুর পর শেষকৃত্য সম্পন্ন করার কোনো পরিকাঠামো নেই। অত্যন্ত অস্বস্তিকর পরিবেশের মধ্যে নদী চরের খোলা আকাশের নিচেই বাধ্য হয়ে স্বজনদের মৃতদেহ দাহ করতে হয়। বছরের অন্য সময়ে কোনোমতে কাজ চালানো গেলেও, আসল বিপর্যয় নামে বর্ষাকালে। এমনও বহু মর্মান্তিক নজির রয়েছে, যেখানে চিতার আগুন পুরোপুরি নেভার আগেই প্রবল বৃষ্টিতে সব ধুয়েমুছে গেছে। তখন সনাতন ধর্মীয় নিয়মকে জলাঞ্জলি দিয়ে আধপোড়া দেহাংশ নদীর পাড়েই মাটিতে পুঁতে ফেলে বাড়ি ফিরতে হয় গ্রামবাসীদের। এখানেই শেষ নয় এমনও দিন গেছে একই সময় এক নদীতেই তিনটির অধিক মৃতদেহ এসে পৌঁছায়।খট্টিমারির বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষের কাছে এটি এক জীবন্ত এবং চরম বাস্তব সংকট। অথচ বছরের পর বছর ভোট আসে, ভোট যায়; সাধারণ মানুষের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয় না। নেতা-মন্ত্রীদের মুখ থেকে একটা নুন্যতম আশ্বাসও মেলে না। জঙ্গল লাগোয়া এই প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষজন মূলত দিনমজুর, দিন আনে দিন খায়। নাগরিক জীবনের এমন করুণ দশার মাঝে দাঁড়িয়ে একটা সামান্য শ্মশান ঘাটের দাবি তোলাটাও যেন আজ তাঁদের কাছে এক পরিহাসের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে!

প্রতিবার নির্বাচনের সময় বিভিন্ন দলের প্রার্থীরা ঢাক-ঢোল পিটিয়ে গ্রামের অলিতে-গলিতে ভোট চাইতে আসেন। মানুষের সুখ-দুঃখের কথা শোনার নাটকও করেন। বঙ্গভূমিতে প্রশ্ন ওঠে , নির্বাচনের বাজারে ঘুরে যাওয়া সেইসব নেতাদের চোখে কি খট্টিমারির সাধারণ মানুষের এই জ্বলন্ত ও বুকফাটা হাহাকার কোনোদিনই চোখে পড়ে না? বঙ্গমাতৃকা কি মানুষের কষ্ট দেখে না? মানুষ বড় কাঁদছে শব্দবন্ধ ক্লিশে হতে থাকে। যেন শান্তি নেই শ্মশানেও ।।

About Post Author