Home » তমলুক লোকসভাঃ জনতার আদালতে আবার কি শেষ রায় দেবেন প্রাক্তন বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়?

তমলুক লোকসভাঃ জনতার আদালতে আবার কি শেষ রায় দেবেন প্রাক্তন বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়?

সময় কলকাতা, অর্কজ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায় ও চুমকী সূত্রধর, ২৩ মেঃ তমলুক নামের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ইতিহাস। পৌরাণিক যুগের বিভিন্ন গ্রন্থেও এই জায়গার কথা উল্লেখ রয়েছে। তখন অবশ্য নাম ছিল ত্ররামলিপি বা তাম্রলিপ্ত। এছাড়াও জায়গাটির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও সংগ্রামীদের ইতিহাস। পরাধীন ভারতের বুকে সমান্তরাল স্বাধীন সরকার তৈরি হয়েছিল এখানেই। নেতৃত্ব দিয়েছিলেন সতীশ চন্দ্র সামন্ত, সুশীল ধারা, অজয় মুখোপাধ্যায়রা। আবার ২০১১ সালে রাজ্যের রাজনৈতিক পালাবদলেও তাত্পর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করে তমলুক বলয়। তমলুক বর্তমানে পূর্ব মেদিনীপুরের সদর শহর। রাজ্যের ৪২ টি লোকসভা কেন্দ্রের মধ্যে অন্যতম। ২৫ মে ষষ্ঠ দফায় রাজ্যের মোট আট কেন্দ্রে ভোট। তারমধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র তমলুক লোকসভা। এই কেন্দ্রের অন্তর্গত সাতটি বিধানসভা কেন্ড হল – তমলুক, পাঁশকুড়া পূর্ব, ময়না, নন্দকুমার, মহিষাদল, হলদিয়া ও নন্দীগ্রাম। এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলটিকে অনেকে বলেন “ অধিকারী পরিবারের গড়”। গত বিধানসভা নির্বাচনে এই কেন্দ্রের অন্তর্গত নন্দীগ্রাম বিধানসভা থেকে পরাস্ত হতে হয়েছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। অধিকারী পরিবারের মেজো ছেলের কাছে হারতে হয়েছিল ১৯৫৬ ভোটের ব্যবধানে।

আরও পড়ুন  মহিলা বিজেপি কর্মীর মৃত্যুর ঘটনায় রণক্ষেত্র নন্দীগ্রাম! প্রতিবাদে আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভ, নামল RAF

স্বাধীনতার পর দীর্ঘদিন এই কেন্দ্রে নিজেদের আধিপত্য ধরে রেখেছিল ভারতের জাতীয় কংগ্রেস। তারপর বাংলা কংগ্রেস, জনতা দলের হাত ধরে এই কেন্দ্রটি দখল করে বামেরা। সত্য গোপাল মিশ্রের হাত ধরে তমলুকের মাটিতে প্রথম বার লাল পতাকা ওড়ে। ১৯৯৬ সালে এই কেন্দ্রটি ফের পুনর্দখল করে কংগ্রেস। কংগ্রেসের টিকিটে জয়ী হন জয়ন্ত ভট্টাচার্য। তবে ১৯৯৮ সালেই ফের কেন্দ্রটি নিজেদের দখলে নেয় বামেরা। এই কেন্দ্র থেকে জয়ী হয়ে সংসদে পৌঁছন সিপিএমের দাপুটে নেতা লক্ষণ শেঠ। তারপর টানা তিনবার এই কেন্দ্র থেকে তিনিই নির্বাচিত হন। ২০০৯ সাল পর্যন্ত কেন্দ্রটি নিজেদের দখলে রেখেছিল বামেরা। তারপর এই কেন্দ্র থেকে টানা দুবার সাংসদ নির্বাচিত হন শুভেন্দু অধিকারী। তবে ২০১৬ সালে রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে তাঁকে প্রার্থী করে তৃণমূল। এই কেন্দ্রেরই অন্তর্গত নন্দীগ্রাম বিধানসভা থেকে দাঁড়িয়ে জয়ীও হন। তাকে রাজ্য মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ দফতরের দায়িত্ব দেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ২০১৬ সালে তমলুক লোকসভা কেন্দ্রে উপনির্বাচন হয়। তৃণমূলের টিকিটে লড়ে বিপুল ভোটে জয়ী হন শুভেন্দুর দাদা দিব্যেন্দু অধিকারী। দ্বিতীয় স্থানে ছিল সিপিএম। তিন নম্বরে শেষ করলেও এই কেন্দ্রে ভোট শতাংশ বাড়িয়ে নেয় বিজেপি।

গত লোকসভা নির্বাচনেও তমলুক থেকে ১ লক্ষ ৯০ হাজার ভোটের ব্যবধানে জয়ী হন দিব্যেন্দু। তৃণমূল প্রার্থী পেয়েছিলেন ৭ লক্ষ ২৪ হাজার ৪৩৩ ভোট। একদা লাল দুর্গ বলে পরিচিত তমলুকে সিপিএমকে পিছনে ফেলে দ্বিতীয় স্থানে উঠে আসে বিজেপি। তাদের প্রার্থী সিদ্ধার্থ নস্কর পেয়েছিলেন ৫ লক্ষ ৩৪ হাজার ২৬৮ ভোট। প্রায় ৩০ শতাংশ ভোট বৃদ্ধি হয় পদ্ম শিবিরের। ২৫ শতাংশ ভোট কমে সিপিএমের। সিপিএম প্রার্থী শেখ ইব্রাহীম আলী পেয়েছিলেন ১ লক্ষ ৩৬ হাজার ১২৯ ভোট। ২০২১ বিধানসভা নির্বাচনের আগে তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেন শুভেন্দু অধিকারী। তারপর অধিকারী পরিবারের সদস্যরাও একে একে নাম লেখান পদ্ম শিবিরে। লোকসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে দিল্লিতে গিয়ে বিজেপিতে যোগ দেন তমলুকের বিদায়ী সাংসদ দিব্যেন্দু অধিকারী। কিন্তু এই নির্বাচনে তাঁকে প্রার্থী করেনি দল। তার বদলে এই কেন্দ্রে বিজেপি প্রার্থী করেছে কলকাতা হাইকোর্টের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়কে। তার বিপরীতে এই কেন্দ্রে তৃণমূল প্রার্থী করেছে দলের তরুণ মুখ দেবাংশু ভট্টাচার্যকে। জাতীয় কংগ্রেসের সমর্থনে সিপিএমের টিকিটে এই আসন থেকে লড়ছেন কলকাতা হাইকোর্টের আইনজীবী সায়ন বন্দ্যোপাধ্যায়।

লোকসভা নির্বাচনের আগে রাজনীতিতে অভিষেক হয় অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের। গেরুয়া উত্তরীয় গলায় যোগ দেন ভারতীয় জনতা পার্টিতে। বিচারবিভাগ থেকে রাজনীতির ময়দানে পা রাখা প্রাক্তন বিচারপতিকে তমলুক কেন্দ্র থেকে প্রার্থী করেছে বিজেপি। এজলাসে বসার সময় একাধিক বিষয়ে মন্তব্য করে প্রচারে আসেন তিনি। প্রধানত দুর্নীতি সংক্রান্ত মামলাগুলিতে বিচারক হিসেবে তার পর্যবেক্ষণ নিয়ে রাজ্য রাজনীতি তোলপাড় হয়। মামলাকারী-সহ রাজ্যের একাংশের কাছে রাতারাতি ভগবান হয়ে উঠেছিলেন প্রাক্তন বিচারপতি। তবে রাজ্যের শাসক দলের পক্ষ থেকে জুটেছিল তীব্র কটাক্ষ। এমনকী, রাজ্যের শাসক দলের পক্ষ থেকে তাঁকে রাজনীতির ময়দানে নামার জন্য চ্যালেঞ্জও জানানো হয়। বিজেপিতে যোগদানের পর তিনি জানিয়েছিলেন, রাজ্যের শাসক দলের সেই চ্যালেঞ্জই গ্রহণ করলেন। গত লোকসভা নির্বাচনে এই আসন থেকে তৃণমূলের জয়ের ব্যবধান ছিল প্রায় ১ লক্ষ ৯০ হাজার। একুশে বিধানসভা নির্বাচনের ফলের নিরিখে সাতটি বিধানসভা কেন্দ্রের তিনটি বিজেপির ও চারটি গিয়েছিল তৃনমূলের দখলে। ময়না, হলদিয়া ও নন্দীগ্রাম বিধানসভা নিজেদের দখলে নেয় পদ্ম শিবির। তমলুক, মহিষাদল বিধানসভায় হারতে হয়েছিল নামমাত্র ভোটের ব্যবধানে।

সেই ফলাফলের নিরিখে রাজনৈতিক পাটিগণিতের হিসেবেবলা যায়, আসন্ন্ লোকসভা নির্বাচনে এই কেন্দ্রে অনেকটাই ভালো জায়গায় রয়েছে বিজেপি। তার উপর এই কেন্দ্রে পর্যবেক্ষকের দায়িত্বে রয়েছেন খোদ শুভেন্দু অধিকারী। দল প্রার্থী করার পর একাধিকবার শান্তিকুঞ্জে গিয়ে অধিকারী পরিবারের অভিভাবক শিশির অধিকারীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে দেখা গিয়েছে অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়কে। শুধু অধিকারী বাড়িতে নয়, তিনি গত কয়েক মাসে পৌঁছেছেন জনতার দরবারেও। শুনেছেন সাধারণ মানুষের অভাব অভিযোগের কথা। অনেক জায়গায় তাঁকে বিক্ষোভের মুখেও পড়তে হয়েছে, যা এসেছে রাজ্যের শাসক দলের নেতা কর্মীদের পক্ষ থেকে। তবুও তিনি যে দমে যাওয়ার বান্দা নন, তা বুঝিয়ে দিয়েছেন। আবার তাকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে বিতর্কও। কারণ প্রচারের মাঝে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে বেলাগাম আক্রমণ করার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। একটি ভিডিও ক্লিপিংস নিয়ে সমাজ মাধ্যমে প্রকাশ করে রাজ্যের শাসক দল, যেখানে বিজেপি প্রার্থী বলছেন, “তৃণমূল বলছে, রেখা পাত্রকে কেনা হয়েছিল ২০০০ টাকায়! মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, তুমি কত টাকায় বিক্রি হও?”এই বক্তব্যের জন্য অভিজিতের প্রচারে ২৪ ঘণ্টা নিষেধাজ্ঞা জারি করে নির্বাচন কমিশন। বিতর্ক থাকলেও এই কেন্দ্রটি নিয়ে চর্চার অন্যতম কারণও অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়।

এই কেন্দ্রটি তৃণমূলের কাছে সম্মান রক্ষার। কারণ অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের বিভিন্ন রায়ে জেরবার হতে হয়েছে রাজ্য সরকারকে। তাকে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে জবাব দেওয়ার এটাই সেরা সুযোগ ঘাসফুল শিবিরের কাছে। অন্যদিকে, গত বিধানসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রাম থেকে শুভেন্দু অধিকারীর কাছে হারতে হয়েছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। তারপর থেকে প্রতিটি জনসভায় সেই জয় নিয়ে মমতাকে খোঁটা দিয়েছেন বিরোধী দলনেতা। সেই হারের ক্ষত এখনও শুকায়নি তৃণমূল সুপ্রিমোর। হলদিয়ার সভা থেকে বদলার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি। তমলুক আসনটি জিতে এক ঢিলে দুই পাখি মারতে চাইছে তৃণমূল। এই কেন্দ্রে ঘাসফুল চিহ্নে লড়ছেন দলের যুবনেতা দেবাংশু ভট্টাচার্য। যিনি টেলিভিশন ডিবেটের দলের পরিচিত মুখ। যুব সমাজের মধ্যে তার গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। একুশের নির্বাচনে তার গাওয়া ‘খেলা হবে’ গানটি অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়। প্রার্থী তালিকা ঘোষণা হওয়ার পর থেকে তিনিও বিজেপি প্রার্থী সম্পর্কে নানা কটূক্তি করেছেন। কখনও অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়কে তুলনা করেছেন সাপের সঙ্গে, আবার কখনও বলেছেন প্রার্থী হিসেবে অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় সব থেকে কম ওজনের। এই কেন্দ্র ধরে রাখার ব্যাপারে আশাবাদী তৃণমূলও।

বিগত কয়েকটি নির্বাচনে রাজ্যের বাকি আসনের মত তমলুকও সাক্ষী থেকেছে বামেদের রক্তক্ষরণের। সাধারণ মানুষ প্রধানত দুটি দলে বিভক্ত – একটা রাজ্যের শকদলের পক্ষে, অন্যটা শাসক বিরোধী শিবিরে। গত দশ বছরে রাজ্যে তৃণমূল বিরোধী শক্তি হিসেবে উঠে এসেছে বিজেপি। ফলে অনেকটা প্রাসঙ্গিকতা হারিয়েছে বামেরা। বামেদের ভোট কিছুটা তৃণমূলে ও অনেকটা চলে গিয়েছে রামের বাক্সে। সেই রক্তক্ষরণ রুখতে এবার মরিয়া বাম শিবির। এই কেন্দ্রে তারা প্রার্থী করেছে আইনজীবী সায়ন বন্দ্যোপাধ্যায়কে। সমাজ মাধ্যম ও টিভি মিডিয়ায় ঝাঁঝালো বক্তৃতার জন্য তিনি জনপ্রিয়। প্রার্থী হওয়ার পর থেকে একদা বাম গড় চষে ফেলেছেন সায়ন। তার কথায় উঠে এসেছে সাধারণ মানুষের রুটি রুজির প্রসঙ্গ। হলদিয়া শিল্পাঞ্চলে কলকারাখানায় কাজের পাশাপাশি এখানকার মানুষের প্রধান জীবিকা কৃষিকাজ। তমলুক ও হলদিয়া মহকুমার বেশিরভাগ পরিবার ধান, পান, ফুল ও বিভিন্ন আনাজ চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। দেশে বিদেশে সুখ্যাতি রয়েছে তমলুকের পানের। এখান থেকে প্রতি বছর কয়েকশো কোটি টাকার পান রফতানি হয়। কিন্তু জেলার এই অন্যতম অর্থকরী ফসল পান ও ফুল সরকারিভাবে কৃষি পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি না পাওয়ায় ন্যূনতম সহায়ক মূল্য ঘোষণা হয় না। নেই সরকারি উদ্যোগে পানের সংরক্ষণ ব্যবস্থাও। প্রতিবার ভোট আসলে মেলে প্রতিশ্রুতি। কিন্তু ভোট শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই সব প্রতিশ্রুতিও মিলিয়ে যায়। কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যাযয়ের ভাষায়, “এই রাজা আসে, ওই রাজা যায়। জামা কাপড়ের রং বদলায়। দিন বদলায় না।” সেই দিন বদলের আশায় এখন তমলুকবাসী।

About Post Author