সময় কলকাতা বীথিন সরকার, ৩১ ডিসেম্বরঃ বদলে গেল শতাব্দী প্রাচীন থিয়েটার হলের নাম। ঠাকুর শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ, নাট্য সম্রাট গিরিশ ঘোষ, নটী বিনোদিনী স্মৃতি বিজড়িত স্টার থিয়েটারের নাম বদলে হল বিনোদিনী থিয়েটার। ইতিমধ্যে নতুন নামের অস্থায়ী ফলক লাগিয়ে ফেলেছে কলকাতা পুরসভা। সরিয়ে ফেলা হয়েছে ঐতিহাসিক স্টার নামের ফলকও। আগামিকাল নতুন স্থায়ী ফলক লাগিয়ে ফেলা হবে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে কার্যকর হল মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশ। কিন্তু কেন? প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
আরও পড়ুনঃ চতুর্থ ম্যাচে হারের পর প্রশ্ন একটাই, বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ছাড়পত্র পাবে ভারত?
১৮৮৩ সালে স্থাপিত এই নাট্যমঞ্চের নেপথ্যের কারিগর বিনোদিনী দাসী। যেখানে বিনোদিনীর নাটক দেখতে গিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলেন খোদ শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস। বিভিন্ন সময়ে নাটক দেখতে পদধূলী পড়েছে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরদের মতো জগদ্বখ্যাত ব্যক্তিত্বদের। স্টার থিয়েটারে ঐতিহ্যকে ধরে রেখেই আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছিল থিয়েটার হলে। নতুন বছর পড়ার আগে সেই প্রেক্ষাগৃহেরই নতুন নামকরণ করলেন মুখ্যমন্ত্রী।
স্টার থিয়েটার নিজের নামে না হওয়ায় তিনি কতটা ‘আঘাত’ পেয়েছিলেন, তা নিজের আত্মজীবনীতে লিখে যান নটী বিনোদিনী। মাঝে কেটে গিয়েছে ১৪১ বছর। এত দিনে ‘প্রতারিত’ বিনোদিনীর নাম স্টার থিয়েটারের সঙ্গে জুড়ে যাচ্ছে। সৌজন্যে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সোমবার সন্দেশখালির সভা থেকে তিনি ঘোষণা করেন, স্টার থিয়েটারের নাম বদলে বিনোদিনীর নামে প্রেক্ষাগৃহের নতুন নামকরণ হবে। অনেকের মতে, এক দিন ‘বঞ্চনা’ করা হয়েছিল বিনোদিনীকে, এত দিনে তিনি তাঁর যোগ্য স্বীকৃতি পেলেন।
১৮৮৩ সালে উত্তর কলকাতারই বিডন স্ট্রিটে প্রথম তৈরি হয় স্টার থিয়েটার। সেই সময় নাট্যব্যক্তিত্ব গিরিশচন্দ্র ঘোষ বিনোদিনীকে স্টার থিয়েটার তৈরির টাকা জোগাড় করার জন্য অনুরোধ করেছিলেন। বলা হয়েছিল তাঁর নামেই নাম রাখা হবে থিয়েটারের। বিনোদিনী নিজের জীবনীতে লেখেন, ‘‘থিয়েটার যখন প্রস্তুত হয় তখন সকলে আমায় বলেন যে ‘এই যে থিয়েটার হাউস্ হইবে, ইহা তোমার নামের সহিত যোগ থাকিবে। তাহা হইলে তোমার মৃত্যুর পরও তোমার নামটী বজায় থাকিবে।’’ ঠিক হয়েছিল প্রেক্ষাগৃহের নাম হবে ‘বি থিয়েটার’। তাতে উৎসাহ পান বিনোদিনী। গিরিশের অনুরোধ ফেলতে পারেননি তিনি। বিনোদিনী তাঁর ভক্ত গুর্মুখ রায়ের কাছ থেকে সেই সময় ৫০ হাজার টাকা তুলে তা দিয়েছিলেন স্টার থিয়েটার তৈরির জন্য। সেই টাকাতেই শুরু হয় থিয়েটার তৈরির কাজ। থিয়েটার উদ্বোধনের কয়েক সপ্তাহ আগে বিনোদিনী জানতে পারেন ‘নাম’ পাল্টে গিয়েছে। নতুন থিয়েটারের রেজিস্ট্রি হয়েছে ‘স্টার’ নামে। বিনোদিনীর নামে ‘নাম’ রাখলে তৎকালীন সমাজ আপত্তি তুলতে পারে সেই ‘যুক্তি’তেই শেষ লগ্নে বিডন স্ট্রিটের প্রেক্ষাগৃহের নাম রাখা হয় স্টার থিয়েটার। এ কথা জানতে পেরে অনেক কিছু বলার ইচ্ছে ছিল বিনোদিনীর। কিন্তু পারেননি। বিনোদিনী লেখেন, ‘‘আত্মসংবরণ করিয়া বলিলাম, ‘বেশ!’’ পরে তিনি বোঝেন তাঁর সঙ্গে ‘ছলনা’ করা হয়েছে। সে সময় বিনোদিনীর মনে হয়েছিল, ‘‘উঁহারা কি শুধু আমায় মুখে স্নেহ মমতা দেখাইয়া কার্য্য উদ্ধার করিলেন? কিন্তু কি করিব, আমার আর কোন উপায় নাই!’’ ‘প্রতারিত’ বিনোদিনী আত্মজীবনীতে লেখেন, ‘‘আমি স্বপ্নেও ভাবি নাই যে উঁহারা ছলনা দ্বারা আমার সহিত এমন ভাবে অসৎ ব্যবহার করিবেন।’’
পাঁচ বছর পরে ১৮৮৮ সালে বিডন স্ট্রিটের ‘স্টার’-এর ঠিকানা বদল হয়। উত্তর কলকাতার হাতিবাগানের কর্নওয়ালিস স্ট্রিট যা আজ বিধান সরণি নামেই পরিচিত, সেখানে দ্বিতীয় স্টার থিয়েটার তৈরি হয়। হাতিবাগানের এই স্টার থিয়েটার তৈরিতে সরাসরি কোনও টাকা দেননি বিনোদিনী। এমনকি, হাতিবাগানের স্টার থিয়েটারে কোনও দিন অভিনয়ও করেননি। কিন্তু নতুন স্টার থিয়েটার গড়ার জন্য সেই সময় নাট্যব্যক্তিত্ব অমৃতলাল বসু, ধর্মদাস সুরে’রা ফের একবার স্টার থিয়েটারের সঙ্গে বিনোদিনীর জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়েছিলেন।
বিডন স্ট্রিটের প্রথম স্টার থিয়েটার নানা হাত বদল হয়ে নাম হয় ‘মনমোহন থিয়েটার’। সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ তৈরির সময়ে ১৯২৮ সালে সেই ‘স্টার’ ভাঙা পড়ে। কিন্তু বিনোদিনী আর স্টারের সম্মিলিত নাম-মাহাত্ম্য এমনই যে, পরবর্তী কালে হাতিবাগানের স্টার থিয়েটারের সঙ্গেও মানুষ বিনোদিনীর স্মৃতি সংযুক্ত করে এসেছেন। সেই স্টারের সঙ্গে এত দিনে জুড়ছে বিনোদিনীর নাম। ১৪১ বছরের লড়াই আজ জিতেছে সেদিনের ‘প্রতারিত’ বিনোদিনী দাসী। স্টার ও মিনার্ভা থিয়েটার হল কলকাতার দুটি সবচেয়ে পুরনো বাণিজ্যিক নাট্যমঞ্চ। স্টার, মিনার্ভা ও ক্লাসিক থিয়েটারে হীরালাল সেন নির্মিত প্রথম চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হয়। স্টার থিয়েটার ভবনটি কলকাতার একটি ঐতিহ্যবাহী ভবন। যদিও ১৯৯০-এর দশকে একটি ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে এই ভবনটি ভষ্মীভূত হয়ে যায়। ২০০০-এর দশকে কলকাতা পৌরসংস্থা বাড়িটি সারিয়ে আবার নাট্যমঞ্চটি চালু করে। বর্তমানে স্টার থিয়েটারের সম্মুখভাগটি পুরনো স্থাপত্যশৈলী অনুসারে নির্মিত হলেও, ভিতরের অংশটি সম্পূর্ণ আধুনিক। এখানে নাটক মঞ্চস্থ হওয়ার পাশাপাশি চলচ্চিত্রও প্রদর্শিত হয় বর্তমানে।


More Stories
পাটুলিতে শুট আউট, নিহত যুবক
বিজেপিকে একমাত্র রুখতে পারেন দিদি : অখিলেশ যাদব
এবার কলকাতায় পাঁচজায়গায় একযোগে সিবিআই হানা