সময় কলকাতা ডেস্কঃ নলিনীকান্ত বাগচি। ইতিহাসের পাতায় থাকা সেই নাম, সেই পড়ুয়ার কথা স্বাধীনতার ৭৫ বছর উদযাপনে যদি মনে না করা হয় তাহলে বোধহয় স্বাধীনতার উদযাপনটা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। কিন্তু সেই নামের আগে শহীদ বসেনি, সেই নাম অমরত্ব পায়নি। যে সম্মান যে শ্রদ্ধা ক্ষুদিরাম বসু, সূর্যসেন, বাঘাযতীন, বিনয় বাদল দীনেশরা পেয়েছেন নলিনীকান্ত বাগচি কিন্তু সেই সম্মানটা পাননি। কি বিপুল বীরত্বের সাহায্যে মাত্র ২২ বছর বয়সেই ব্রিটিশ প্রশাসনের মাইনে করা বাঙালি পুলিশের হাতে শহীদ হতে দ্বিধাবোধ করেনি সে।
বাংলার প্রথম শহীদের আত্মত্যাগকে প্রায় ভুলতেই বসেছে বাঙালিরা। এমনকি তাঁর আপন দেশ মুর্শিদাবাদের ধুলিয়ানও তাঁর নামটাই জানে না। কিন্তু এই হারিয়ে যাওয়া স্মৃতি হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস কি নব রূপে মানুষের কাছে ফিরিয়ে আনছেন আরও এক বাঙালি। স্বাধীনতার অমৃত মহোৎসবের আগে নলিনীকান্ত বাগচি ফিরছেন তথ্যচিত্রের মাধ্যমে। ধুলিয়ানের তথ্যচিত্রকার সুমিত ঘোষ আপাতত ব্যস্ত মনে প্রাণে নলিনীকান্ত বাগচীকে ফের জাগিয়ে তুলতে।
যখন স্বাধীনতার সংগ্রামের কারণে পাড়ায় পাড়ায় অনুশীলন সমিতি বা যুগান্তরের মতো গুপ্ত সমিতি গুলো তৈরি হচ্ছিল তরুণ তাজা রক্ত দিয়ে। তেমনি এক তরুণ তাজা রক্ত ছিল নলীনিকান্ত বাগচী। ১৯১৩ সালে পাকুর হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় সে চতুর্থ হয়েছিল। কুড়ি টাকার জল পানির বিনিময়ে ভর্তি হয়েছিল বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজে। যে কলেজ বিপ্লবীদের আঁতুরঘর হিসেবে বদনাম হয়েছিল। অথচ এই কলেজেই এক ইংরেজ সাহেব স্যার এডওয়ার্ড মন্টেগু হুইলার ছাত্রদেরকে দেশপ্রেমের শিক্ষা দিতেন। সেই শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ হয়ে নলিনীকান্ত বাগচি ধীরে ধীরে পুড়তে শুরু করল স্বাধীনতার আগুনে।
এই কলেজেই অন্যদিকে পড়াশোনা করেছিলেন মাস্টারদা সূর্যসেন। স্বাধীনতার আগুনে পুড়তে থাকা নলিনী অনুশীলন সমিতিতে নাম লিখিয়েছিলেন। শুরু করেছিলেন বিহারের সংগঠন গড়ার কাজ। বালামের যুদ্ধের পর যখন ইংরেজরা চারদিকে ধরপাকড় আর অত্যাচার বাড়িয়ে চলেছে সেই সময় গৌহাটিতে গা ঢাকা দিয়েছিল নলিনীকান্ত বাগচি। ১৯১৬ সাল থেকে তার নাম পুলিশের খাতায় ফেরার হিসেবে নথিভুক্ত ছিল। কিন্তু ভাগ্যের ফের এমনই যে প্রবল শীতের রাতে ইংরেজদের বেতনভোগ পুলিশ নলিনিকান্তদের আস্তানা ঘেরাও করেছিল কয়েকটা দেশীয় রাইফেলার কার্তুজ দিয়ে পুলিশ বাহিনীকে ঠেকানো কার্যত অসম্ভব ছিল। কিন্তু তার পরেও সেই অসম্ভবকে সম্ভব করেছিল নলিনীকান্ত বাগচি।

কিন্তু সেখানে এসে থেমে যায়নি। গোপনে গোপনে সংগঠনের কাজ জারি রাখেন তিনি। সাধারণ কর্মী থেকে সংগঠনের প্রভিনসিয়াল অর্গানাইজার হিসেবে স্বীকৃতি পান তিনি। অথচ সে তখনও বোধহয় কৈশোরের গণ্ডিটাই পেরোয়নি। ঢাকাতেও বেশ কয়েকদিন গা ঢাকা দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সেই বাসস্থানেও এসপি বসন্ত মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে হানা দেয় পুলিশ। সেবার আর বাঁচতে পারেনি নলিনীকান্ত বাগচী ১৯১৮ সালের ১৫ জুন কিংবা অন্য একটি তথ্য অনুযায়ী ১৬ই জুন পুলিশের গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যায় তরুণ নলিনীর দেহ।
বুকের ভিতর প্রাণটা ধুকপুক ধুকপুক করছে। মিটফোর্ড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল তাঁকে। পরিচয় জানতে পেরে অত্যাচার দ্বিগুণ হতে থাকে। সময় সময়ে তা তিনগুণ চার গুণের মাত্রাও পেরিয়ে যায়। কিন্তু সেই অদম্য ইচ্ছে শক্তি হার মানেনি পুলিশের কাছে। একটি বারের জন্য কোন তথ্য তারা বের করতে পারেনি নলিনীর মুখ থেকে। আর্কাইভ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী মিটফোর্ড হাসপাতালেই মৃত্যু হয় নলিনীকান্ত বাগচীর এই বাংলার প্রথম শহীদের জীবনাবসান ঘটে। পুলিশের অত্যাচারে যখন মৃত্যু শয্যায় রয়েছেন নলিনীকান্ত সেই সময় নাকি বলেছিলেন, স্টপ ডগ ডোন্ট ডিস্টার্ব মি। লেট মি ডাই ইন পিস। নলিনীকান্ত বাগচীর এই হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসের কথা এবার তথ্যচিত্রে দেখা যাবে।


More Stories
ইউসিসি বা অভিন্ন দেওয়ানি বিধির প্রভাব কোথায়? বিরোধিতা কেন?
১৫ আগস্ট ইনডিপেনডেন্স ডে নয়, অর্থ গুলিয়ে ফেলে নতুন সংজ্ঞা শান্তনু ঠাকুরের
নেতাজি ইস্যু : অনন্ত মহারাজকে উন্মাদ আখ্যা দিলেন অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত!