পুরন্দর চক্রবর্তী, সময় কলকাতা, ২৫ এপ্রিল: তিনি বিশ্বকাপ জেতেন নি, কিন্তু পেলের পরবর্তী সময়ে তিনি ছিলেন ফুটবল বিশ্বসেরা। অন্তত ফুটবল বিশেষজ্ঞ মহল সেকথাই বলে। গত শতাব্দীর শেষে এসে আইএফএফএইচএসের (International Federation of Football History & Statistics) তত্ত্বাবধানে ক্রীড়া সাংবাদিক এবং বিশ্বের বাছাই করা প্রথমসারির ফুটবলারদের ভোটে গত শতাব্দীর সেরা খেলোয়াড় নির্বাচন করা হয়েছিল। সেখানে পেলের পরেই দ্বিতীয় শ্রেষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে নির্বাচিত হন তিনি। তিনি জোহান ক্রুয়েফ। ২৫ এপ্রিল হেন্ড্রিক জোহানেস ক্রুয়েফের জন্মদিন যিনি আন্তর্জাতিক ফুটবল দুনিয়ায় জোহান ক্রুয়েফ নামেই পরিচিত। নেদারল্যান্ডসের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ফুটবলারের পরিচয় কেবলমাত্র ফুটবলার হিসেবে সীমাবদ্ধ ছিল না তিনি ছিলেন একজন সফল কোচ তথা ফুটবল ম্যানেজার। তিনি তাঁর সময়ে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ খেলোয়াড়দের একজন হিসেবে বিবেচিত হতেন। তাঁর ফুটবল খেলার সৌন্দর্যে যা মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখত দর্শকদের।

তিনি ১৯৭১, ১৯৭৩ এবং ১৯৭৪ সালে তিনবার ব্যালন ডি’অর জিতেছিলেন। পাশাপাশি ক্রুয়েফ ছিলেন ফুটবল দর্শনের একজন প্রবক্তা। যিনি রিনাস মিশেলের টোটাল ফুটবলকে আলাদা মাত্রা দিয়েছিলেন। তার খেলার ধরন এবং ম্যানেজার হিসাবে তার ধারণাগুলির সুদূরপ্রসারী প্রভাবের কারণে তাকে আধুনিক ফুটবলের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হিসাবে গণ্য করা হয়। সর্বকালের সেরা খেলোয়াড়দের একজন হওয়া ছাড়াও, ক্রুয়েফকে ইতিহাসের অন্যতম সেরা ম্যানেজার হিসেবেও বিবেচনা করা হয়। আজকের বার্সেলোনা বিশ্বব্যাপী খ্যাতির পেছনেও রয়েছেন ক্রুয়েফ। ফুটবল সাংবাদিক গ্রাহাম হান্টার ২০১১ সালে একটা বই লিখে ছিলেন। বইটির নাম ‘বার্সা : দ্যা মেকিং অফ দ্যা গ্রেটেস্ট টিম ইন দ্যা ওয়ার্ল্ড” শিরোনামে। সেই বইয়ে লেখা ছিল যা বার্সেলোনার ফুটবল প্রেমীদের প্রাণের কথা –

“যদি বার্সেলোনার ১,৭৫,০০০ সদস্য রাতের পর রাত এক সারিতে দাঁড়িয়ে তাকে সম্মান জানায়, তার ক্লান্ত পা-কে ম্যাসাজ করে দেয়, তার জন্য রাতের খাবার প্রস্তুত করে দিয়ে তাকে বিছানা পর্যন্ত পৌঁছে দেয়, এমনকি নিজেদের পারিশ্রমিকের অর্ধেকও ক্রুয়েফকে দিয়ে দেয়, তাহলেও ক্রুয়েফের ঋণ পরিশোধ করা সম্ভব হবে না। তিনি যদি বার্সেলোনাতে একটি দর্শন আরম্ভ করতে না পারতেন, তাহলে মাত্র ১৩ বছর বয়সেই লিওনেল মেসির মতো একজন খেলোয়াড়কে ব্যর্থ মনোরথে বাড়ি ফিরে যেতে হতো এবং ইনিয়েস্তার মতো খেলোয়াড়ও সুযোগ পেতেন না। ক্রুয়েফ হচ্ছেন ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ।” কোচিং জগতের বাইরে ফুটবলার হিসেবে অসম্ভব সফল ছিলেন তিনি। ১৯৬৬ সাল থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত খেলে নেদারল্যান্ডসের তিনি ৪৮ টি ম্যাচ খেলে ৩৩ টি গোল করেছিলেন। ৫১৮ টি প্রথম শ্রেণীর ফুটবল ম্যাচে তার গোল ছিল ২৯৪টি। গোলই শেষ কথা ছিল না, তাঁর পায়ে ফুটবল কথা বলত। তাঁর নান্দনিক ফুটবলের বন্দনা না করে উপায় নেই। শিল্পী ফুটবলার ছিলেন তিনি। ফুটবল থেকে অবসর নিয়ে কোচিং জগতের সঙ্গে পুরোপুরি জড়িয়ে পড়েন।

দীর্ঘদিন কোচ ও ম্যানেজার হিসেবে তিনি নতুন ভাবনার বিকাশ ঘটান। এরমধ্যে আট বছর ছিলেন বার্সায়। ৬৯ বছরে তিনি ক্যান্সারে ভুগে প্রয়াত হন। তাঁর ক্যান্সার অনেক আগেই ধরা পড়েছিল। এই প্রসঙ্গে একটি পুরনো ছবি তুলে না ধরলেই নয়। ১৯৯২ সালে লন্ডনের ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামে ইউরোপিয়ান কাপ ( বর্তমানে যা কিনা চ্যাম্পিয়নস লিগের ) ফাইনালে সাম্পাদোরিয়াকে হারিয়ে বার্সালোনা প্রথমবার এই টুর্নামেন্ট জয়ী হয়। ১১২ মিনিটে রোনাল্ড কোম্যান গোল করেছিলেন। বার্সেলোনার উত্থানের শুরুর দিনে সেই ম্যাচের ডাগ আউটে ললিপপ মুখে দিয়ে ক্রুয়েফের অস্থির পদচারণা দেখে অবাক হয়েছিলেন অনেকেই। টেনশনে সিগারেট খান অনেকে। তখন যে সিগারেট ছেড়ে দিয়েছেন একদা চেন স্মোকার ক্রুয়েফ। ক্যান্সার থাবা বসিয়েছে বুকে। ললিপপ মুখে নিয়ে ডাগ আউটে এই চিত্র তাঁর ম্যানেজারিয়্যাল ক্যারিয়ারে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে যায়। চ্যাম্পিয়ন্স লীগে বার্সেলোনাকে প্রথম বার চ্যাম্পিয়ন করার ২৪ বছর পরে সেই ক্যান্সারেই চলে যান ক্রুয়েফ। ২৫ এপ্রিল তাঁর জন্মদিনের সময় কলকাতার পক্ষে তাঁকে শ্রদ্ধার্ঘ্য।


More Stories
চেন্নাইয়ানকে হারিয়ে মোহনবাগানকে টপকে ইস্টবেঙ্গল তিন নম্বরে
কেকেআর-কে হারালেন, কে এই মুকুল চৌধুরী ?
গ্রেফতার অজি ক্রিকেট তারকা ওয়ার্ণার