Home » ৬৮ বছরের পথের পাঁচালী আজও অপরাজিত

৬৮ বছরের পথের পাঁচালী আজও অপরাজিত

পুরন্দর চক্রবর্তী,সময় কলকাতা,২৬ আগস্ট : “১৯৫৫ সালে ‘পথের পাঁচালী ছবি মুক্তিলাভ করার আগে চিত্রসমালোচকদের কাছে পরিচালক হিসেবে  আমার কোনও পরিচিতি ছিল না। অর্থাৎ পথের পাঁচালী রচিত হয়েছিল সমালোচনা নিরপেক্ষভাবেই।। সমালোচনার প্রভাব যদি আমার রচনায় বিস্তৃত হয়ে থাকে তবে তা হয়েছে পথের পাঁচালীর পর থেকে। কিন্তু আজও  যখন অধিকাংশ চিত্র পরিচালক বলে থাকেন যে  পথের পাঁচালী ই আমার শ্রেষ্ঠ ছবি তখন সভাপতি প্রশ্ন জাগে – তাহলে কি সমালোচনার প্রভাব আমার শিল্পে কল্যাণকর হয়নি?” সত্যজিৎ নিজেই তাঁর ‘পরিচালকের দৃষ্টিতে সমালোচক’ শীর্ষক প্রবন্ধে এমনটা লিখে গেছেন। বিষয়  সমালোচনার নয়, এমনকি শুধু পরিচালনার ও নয়,৬৮ বছর বয়স হয়ে গেল, তবুও যেকোনও নিরিখেই পথের পাঁচালীর শ্রেষ্ঠত্ব শুধু সত্যজিতের রায়ের সৃষ্টির মধ্যে সীমিত নেই। বিশ্বের তাবড়-তাবড় সমালোচকের মতে, ভারতের সর্বকালের  সেরা ছবির নাম পথের পাঁচালী ।

সত্যজিৎ রায় নিজেও সেকথা মানতেন।  তিনি বলেছিলেন, ” অন্য কোন দিশি ছবি সম্পর্কে এত বিশদভাবে আলোচনা হয়েছে বলে আমার জানা নেই। কোন শিল্পীর পক্ষে সবচেয়ে পীড়াদায়ক তার রচনা সম্পর্কে  সমালোচকের উদাসীন্য “। সিনেমার ক্ষেত্রে অবশ্যি দর্শক ও সমালোচকের পর্যায়ে পড়েন, কারণ তাঁর রুচি ও মতামতের ওপরই ছবির আর্থিক সাফল্য নির্ভর করে। ” দেখা গিয়েছে তথাকথিত চিত্র সমালোচক বা সাধারণ দর্শক  কেউই পথের পাঁচালীর শ্রেষ্ঠত্ব উপেক্ষা করতে পারেন না। শিল্পের দৃষ্টিকোণ থেকে শিরোপা পাওয়ার  বা সাধারণ দর্শকদের মন জয় করার যাবতীয় উপাদান ছিল এই চলচ্চিত্রে।

বিগত ১০০ বছরের সেরা ১০০টি চলচ্চিত্রের তালিকা  প্রকাশ করেছে টাইম ম্যাগাজিন আর সেখানে একমাত্র ভারতীয় চলচ্চিত্র হিসেবে স্থান পেয়েছে  পথের পাঁচালী। অর্থাৎ ২০২৩ সালে এসেও সত্যজিৎ রায়ের পথের পাঁচালী  গ্রহণযোগ্যতা তুলনাহীন। এর আগে ‘সাইট এন্ড সাউন্ড ‘ নামে বিখ্যাত ব্রিটিশ ম্যাগাজিনের  সমীক্ষা অনুযায়ী বিশ্বের সর্বকালীন  সেরা ১০০ টি চলচ্চিত্রের মধ্যে স্থান পেয়েছিল পথের পাঁচালী। অথচ এই চলচ্চিত্রটি  তৈরি করতে মাঝে মাঝেই অর্থজনিত সমস্যায় ভুগতে হয়েছে। আড়াই বছর ধরে চলচ্চিত্রটি নির্মিত হয়। অথচ স্বল্প ব্যায়ে অপেশাদার অভিনেতা ও অনভিজ্ঞ শিল্পীদের নিয়ে এই চলচ্চিত্র নির্মিত হয়। ১৯৫৫ সালের ২৬ আগস্ট ভারতে চলচ্চিত্রটি মুক্তি পেলেও  তার আগে ১৯৫৫ সালের ৩মে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের  নিউইয়র্কে একটি প্রদর্শনীতে চলচ্চিত্রটি মুক্তি পায়। চলচ্চিত্রটি মুক্তির পরেই ভারত ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে  বিবিধ সম্মানে ভূষিত হয়। উল্লেখযোগ্যভাবে, কান চলচ্চিত্র উৎসবে  পথের পাঁচালী কে শ্রেষ্ঠ মানবিক দলিলে পুরস্কৃত করা হয়।

সত্যজিৎ রায়  পথের পাঁচালীর মুক্তির ২৫ বছর উপলক্ষ্যে সিনে সেন্ট্রাল আয়োজিত ভাষণে বলেছিলেন অন্যদের কাছে চলচ্চিত্রটির বয়স ২৫ বছর হলেও  তাঁর কাছে সংজ্ঞা অন্যরকম। সামান্য টাকা সংগ্রহ করে চলচ্চিত্রটি আরম্ভ করার সময় থেকে ধরলে  ১৯৮০ সালেই বইটির বয়েস দাঁড়ায়  প্রায় ২৮ বছর। অর্থাৎ ১৯৫৫ সালের ২৬ আগস্ট পথের পাঁচালী মুক্তি পেলেও সত্যজিৎ রায় আজ বেঁচে থাকলে,২০২৩ সালে  বলতেন- ৬৮ নয়, চলচ্চিত্রটির বয়স ৭১ বছর। তিনি বলেছেন, নিজে এই চলচ্চিত্র নির্মাণের কথা সবসময় খুব সুখের সঙ্গে স্মরণ করেছেন তাও নয় কারণ মাঝে মাঝে কাজ স্থগিত হয়ে গেলে  আবার কবে কাজ শুরু হবে জানা না থাকায় অস্বস্তিকর পরিস্থিতি দেখা দিত।  এরকম অস্বস্তিকর পরিস্থিতির ফলে যে বাধা আসত তার উদাহরণও দিয়েছিলেন তিনি -দুর্গার চরিত্রে অভিনয়কারী  উমা দাশগুপ্তের কথা টেনে। একবার চলচ্চিত্র দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার দুমাস পরে আবার যখন চলচ্চিত্র শুরু হল তখন দুর্গাকে তাঁর বাবার কাছে অভিনয়ের জন্য চেয়েছিলেন।সত্যজিৎ রায়কে উমা দাসগুপ্তের বাবার কাছে শুনতে হয়েছিল, “লেবু পোছলে কচলে আর কত তেতো করবেন মশাই?’ দুর্গাকে তবুও তিনি পেয়েছিলেন। বাধা-বিপত্তির মধ্যে দিয়েও নিজের মত করে বিভূতিভূষণের কালজয়ী উপন্যাসকে চলচ্চিত্র উপযোগী করেছিলেন যদিও সত্যজিৎ রায় স্বীকার করেছেন মূল উপন্যাসের বারোআনা ঘটনাই চলচ্চিত্রে ব্যবহার করা হয়নি। তবে পথের পাঁচালী বলতে  মানুষের মনে প্রথমেই যেসব দৃশ্য ভেসে ওঠে  তার অধিকাংশই চলচ্চিত্রে স্থান দেওয়া হয়েছিল। ইন্দিরা ঠাকুরণের চরিত্রে  অনেকটাই স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছিল অথচ উপন্যাস মেনে চললে  চলচ্চিত্রের শুরুতেই ” ইন্দিরের মৃত্যু হওয়া উচিত। ”  সত্যজিৎ রায়ের পথের পাঁচালী সম্পর্কে নিজের বক্তব্য বা আত্মসমীক্ষর নির্যাস চলচ্চিত্রটি সাফল্যের কারণ তুলে ধরে।প্রয়োজন অনুযায়ী চরিত্রগুলিকে স্বাধীনতা দিয়ে এবং চলচ্চিত্রের স্বার্থে কাহিনীর সঠিক চলচ্চিত্রায়ন করে ,মূল গল্পের মূল রস অব্যাহত রেখে, চরিত্র থিম বা প্লটের বাইরে কিছু লক্ষণ যথাযথভাবে রেখে (যেমন কনট্রাস্ট  বজায় রেখে ),কাহিনীর গতি ক্ষুন্ন না করে পথের পাঁচালী চলচ্চিত্রকে  সত্যজিৎ দিয়েছেন অমরত্ব। আর তাই ৬৮ পার করে এসে পথের পাঁচালী আজও অপরাজিত।।

About Post Author