সময় কলকাতা ডেস্ক:- কলকাতা থেকে দাঁড় টানা ডিঙি নৌকো নিয়ে দুই যুবক রওনা হয়েছিলেন আন্দামানের উদ্দেশ্যে। সফলও হয়েছিলেন তারা। তাঁর মধ্যে একজন ছিলেন বাঙালি। কিন্তু সময়ের তালে সেই বীর বাঙালিকে ভুল গেছে বর্তমান প্রজন্ম। মনে রাখেনি দুঃসাহসিক অভিযানের সেই ইতিহাস। বীরত্ব বাঙালির রক্তে তা প্রমান করেছিলেন, বছর তেইশের যুবক পিনাকীরঞ্জন চট্টোপাধ্যায়।
দিনটা ছিল ১ ফেব্রুয়ারি, ১৯৬৯ । কলকাতায় গঙ্গার বুকে দাঁড় টানা ডিঙি নৌকোয় দুই যুবক রওনা হলেন আন্দামানের উদ্দেশ্যে। এক হলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শারীরবিদ্যার গবেষক, রোয়িং চ্যাম্পিয়ন পিনাকীরঞ্জন চট্টোপাধ্যায়। আর তাঁর সঙ্গে, বছর ২৫ এর ভারতীয় নৌসেনার অফিসার জর্জ অ্যালবার্ট ডিউক। অনেক ঝড়-ঝঞ্ঝা পার করে ৩৩ দিনের এই দুঃসাহসিক অভিযান জয় করেছিলেন তাঁরা।
কালীঘাটের সদানন্দ রোডের বাসিন্দা ছিলেন পিনাকী। ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন দেখতেন ক্রীড়াবিদ তথা সাঁতারু হবার। স্বপ্ন পুরণ হয়েছিল তাঁর, ১৮ বছর বয়সেই। রোয়িং চ্যাম্পিয়ন হন তিনি। ২১ বছর বয়সে কলকাতা বিজ্ঞান কলেজের শারীরশিক্ষার অধ্যাপক হিসাবে নিযুক্ত হন পিনাকীরঞ্জন। মাত্র তেইশ বছর বয়সে ১০০০ মাইল নৌকাযাত্রায় গড়ে ফেলেন বিশ্বরেকর্ড। পালহীন একটা ছোট্ট ডিঙি নৌকো। লম্বায় কুড়ি ফুট, চওড়ায় পাঁচ ফুট আর উচ্চতা সাড়ে চার ফুট। আর তাতে করেই সমুদ্র পাড়ি জমিয়েছিলেন পিনাকী আর ডিউক। নৌকোর নাম ছিল কানোজি আংরে। শিবাজীর নৌ সেনাপতি তুকোজি আংরের ছেলে ছিলেন কানোজি আংরে। একাই ইংরেজদের বহু জাহাজকে ধ্বংস করেছিলেন। সেই কানোজির নামেই নৌকোর নামকরণ করা হয়েছিল। নামকরণটা করেছিলেন বিশ্ববন্দিত সাঁতারু মিহির সেন স্বয়ং।
কলকাতার ম্যান অব ওয়ার জেটি থেকে প্রথম এভারেস্ট জয়ী তেনজিং নোরগের পিস্তলের আওয়াজের সঙ্গে সঙ্গে যাত্রা শুরু করেন পিনাকী ও ডিউক। গন্তব্য পোর্টব্লেয়ারের আর্বেডিন জেটি। অভিযানের নকশা করেছিলেন নৌসেনার কমান্ডার রথীন দাস।
যাত্রা শুরুর, প্রথম কয়েকদিন বেশ ঠিকঠাকই ছিল। কিন্তু বিপত্তি এল আট দিনের দিন। ৮ তারিখ থেকে খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না পিনাকী আর ডিউকের কানোজি আংরকে। বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় রেডিও যোগাযোগ। প্রায় এক সপ্তাহ কোনও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি কানোজি আংরের সঙ্গে। ১৪ ফেব্রুয়ারি বায়ুসেনাদের নজরে আসে পিনাকী আর ডিউকের নৌকো। কলকাতা থেকে ওরা তখন ১৯০ মাইল দূরে। এর পর এগারো দিন আর কোনো সমস্যা হয়নি। কিন্তু ফের বিপত্তি দেখা দেয় ২৫ ফেব্রুয়ারি রাতে। ফের বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় রেডিও যোগাযোগ। ঠিক ৩ দিন পর ২৮ তারিখ রাতে ভারতীয় নৌবাহিনীর একটি জাহাজ কানোজি আংরে-র খবর পাঠায় শিপিং কপোর্রেশনের জাহাজ এম ভি নিকোবরকে। তখন পোর্টব্লেয়ার থেকে কানোজি আংরের দূরত্ব অন্তত, ৩৮০ মাইল।
জানা যায়, ২৩ ফেব্রুয়ারি ইন্দোনেশিয়ায় এক ভয়ঙ্কর ভূমিকম্প হয়। আর তাতে সমুদ্র উথালপাতাল এক-একটা ঢেউ তখন ২০ ফুট উঁচু। নৌকায় জল উঠে যায়। টানা তিন দিন, তিন রাত নৌকো থেকে পাম্প করে জল ফেলতে হয়েছিল ডিউক আর পিনাকীকে। পানীয় জলও অনেকটা নষ্ট হয়ে যায়। সমুদ্রের জলে ওষুধ দিয়ে তা-ই পান করতে হয়েছিল তাদের। ঢেউয়ে একটি কম্পাস-ও ভেঙে যায়। নষ্ট হয়ে যায় রেডিও।
৮ই মার্চ তাঁরা সকাল ৯টা ৫৫ মিনিটে পোর্টব্লেয়ারের অ্যাবার্ডিন জেটিতে পৌঁছায় পিনাকী আর ডিউকের কানোজি আংরো। পোর্টব্লেয়ারের সমুদ্রতীরে তখন জনসমুদ্র। রসগোল্লা খেয়ে উজ্জাপন করেন এই অভিযানকে।
ভারতীয় নৌসেনার প্রাক্তন কম্যান্ডার জর্জ অ্যালবার্ট ডিউক পরে এক ইন্টারভিউতে জানিয়েছিলেন, কলকাতা থেকে নৌকায় ইন্দোনেশিয়া যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন তারা। সেই অভিযান বাস্তবায়িত হওয়ার আগেই পিনাকির মৃত্যু হয়। যদিও পিনাকির মৃত্যুর কারণ রহস্যময়।পিনাকির মৃত্যু হয় ১৯৮৩ সালের ২৪ শে সেপ্টেম্বর। পিনাকীর বয়স তখন মাত্র ৩৭ বছর। ‘কনৌজি আংরে’-র অভিযান কি আদৌ বঙ্গ সমাজ মনে রেখেছে? এই কৃতি বাঙালিকে সঠিক সন্মান দিতে পারলনা খোদ বাঙালি!


More Stories
চমকে দিলেন ট্রাম্প, কোন প্রেক্ষাপটে ভারত – মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি? কেন ট্রাম্পের অবস্থান বদল?
ঋত্বিক ঘটক : জন্মশতবর্ষে নীলকন্ঠ বাগচীর খোঁজে
উত্তর ২৪ পরগনায় আইএসএফ ও তৃণমূল সংঘর্ষ, জখম একাধিক কর্মী