Home » ২০২৫ : তারার দেশে তারকা, আমরা যাদের হারিয়েছি

২০২৫ : তারার দেশে তারকা, আমরা যাদের হারিয়েছি

পুরন্দর চক্রবর্তী,সময় কলকাতা , ৩০ ডিসেম্বর : ২০২৫ সাল দেখেছে অসংখ্য তারকাপতন। এবছর চলচ্চিত্র জগতের তারকাদের অনেকেই প্রয়াত হয়েছেন।২০২৫ সালে তারার দেশে পাড়ি দেওয়া তারকা বা চলচ্চিত্র জগতের সেলিব্রেটি অসংখ্য,তাঁদের মধ্যে কয়েকজনকে স্মরণ করে সময় কলকাতার বর্ষশেষের শ্রদ্ধার্ঘ্য। সূচনায় দেশের তারকাদের স্মরণ করা যাক, প্রথমেই হিন্দি চলচ্চিত্রের তারকাদের কথা উল্লেখ করা যাক :

মনোজ কুমার :  হিন্দি চলচ্চিত্র জগতের সর্বকালের সেরা নায়কদের তালিকায় থাকা মনোজ কুমার প্রয়াত হন এপ্রিল মাসের ৪ তারিখে। মূলত রোমান্টিক নায়ক হিসেবেই তাঁর পরিচিতি ছিল। তিনি একজন সফল পরিচালকও ছিলেন। তার উল্লেখযোগ্য সিনেমার মধ্যে রয়েছে ‘উপকার’ (১৯৬৭), ‘নীল কমল’ (১৯৬৮), ‘পুরব অর পশ্চিম’ (১৯৭০), ‘শোর’ (১৯৭২), ‘রোটি কাপড়া অর মাকান’ (১৯৭৪) এবং ‘ক্রান্তি’ (১৯৮১)। মনোজ কুমার পদ্মশ্রী ও দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার সম্মানিত হয়েছিলেন।

মুকুল দেব: ১৩ মে মাত্র ৫৫ বছর বয়সে প্রয়াত হন মুকুল দেব। ১৯৯৫ সালে থ্রিলার -দস্তক চলচ্চিত্রে নায়ক হিসাবে চলচ্চিত্র জীবন শুরু করলেও পরবর্তী সময়ে পার্শ্ব চরিত্রে তাঁকে বেশি দেখা গিয়েছে তবে  বিভিন্ন ভাষার চলচ্চিত্রে চুটিয়ে অভিনয় করেছেন তিনি। ভারতের ইংরেজি ভাষার প্রথম সিরিয়াল এ মাউথফুল অফ স্কাই-এর জন্য তিনি স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

ধীরাজ কুমার  :  হিন্দি চলচ্চিত্রের একদা প্রতিভাবান শিল্পী বলেই তাকে গণ্য করা হত। রোটি কাপড়া অউর মাকান,  সরগম বা ক্রান্তির মত চলচ্চিত্রে নজরকাড়া অভিনয়ের পাশাপাশি ১৯৭৭ সালের স্বামী চলচ্চিত্রে  নায়কের চরিত্রে সাড়া ফেলেছিলেন  ধীরাজকুমার।  ১৫ জুলাই ৭৯ বছর বয়সে প্রয়াত হন। ছোট পর্দায় অসংখ্য সিরিয়ালে তিনি ছিলেন অত্যন্ত পরিচিত মুখ।

জুবিন গর্গ : চলচ্চিত্র জগতের সঙ্গে জুড়ে থাকা গায়ক জুবিন গর্গ অকাল প্রয়াত হয়েছেন ২০২৫ সালে।  ১৯ সেপ্টেম্বর ৫২ বছর বয়সে সিঙ্গাপুরে স্কুবা ডাইভিং-এর সময় মৃত্যু মুখে পতিত হন জুবিন গর্গ। জনপ্রিয় অসমীয়া গায়ক মৃত্যুতে রেখে গিয়েছেন রহস্য, রেখে গিয়েছেন কালজয়ী অসংখ্য গান।

সন্ধ্যা শান্তারাম : ৪ অক্টোবর ৯৪ বছর বয়সে তারার দেশে পাড়ি দিয়েছেন একদা নায়িকা হিসেবে স্মরণীয় কিছু চলচ্চিত্র রেখে যাওয়া সন্ধ্যা শান্তারাম। দো আঁখে বারা হাতের মত আলোড়ন ফেলা ও স্মরণীয় চলচ্চিত্রের অভিনেত্রী সন্ধ্যা নর্তকী হিসেবেও খ্যাত ছিলেন।  হিন্দি চলচ্চিত্রের প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্ব ভি শান্তারামের সঙ্গে তার বিবাহ হয়েছিল।

পঙ্কজ ধীর : মহাভারত, কর্ণ ও পঙ্কজ ধীর একসূত্রে গাঁথা।  বি আর চোপড়ার ” মহাভারত”  দূরদর্শনের পর্দায় এক কথায় বিপ্লব ঘটিয়েছিল।  ১৯৮৮ সালের মহাভারত আজও স্মরণীয়, স্মরণীয় মহাভারতের কর্ণ চরিত্রে পঙ্কজ ধীরের অভিনয়। সড়ক,  বাদশার মতো অসংখ্য চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি।  ১৫ অক্টোবর ৬৮ বছর বয়সে প্রয়াত হন পঙ্কজ ধীর।

আশরানি : ২০ অক্টোবর ৮৪ বছর বয়সে প্রয়াত হন হিন্দি চলচ্চিত্রের সর্বকালের অন্যতম সেরা কৌতুক অভিনেতা গোবর্ধন আশরানি। জয়পুরে জন্ম, প্রয়াণ মুম্বাইয়ে। কৌতুক অভিনেতার পাশাপাশি পার্শ্ব চরিত্র বা প্রধান চরিত্রেও দেখা গেছে তাঁকে। তবে সিনেমা প্রেমীরা  আলাদাভাবে মনে রাখবে শোলে চলচ্চিত্রের জেলারকে। ঋষিকেশ মুখার্জির চলচ্চিত্রে তাঁকে যেমন স্বাভাবিকভাবেই দেখা যেত, এই শতকে প্রিয়দর্শনের চলচ্চিত্র গুলিতেও কমেডিয়ানের রোলে প্রায়ই দেখা গিয়েছে তাঁকে। বাবুর্চি,অভিমান, চুপকে চুপকের মত হেরাফেরি, হালচাল বা ভগমভগ এই তালিকায় থাকবে। বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্র পরিচালনাও করেছেন তিনি।

সতীশ শা : ২৫ অক্টোবর ৭৪ বছর বয়সে  প্রয়াত হন চলচ্চিত্র অভিনেতা সতীশ শা। আশির দশকে দূরদর্শনে ইয়ে জো হ্যায় জিন্দেগীতে সাড়া ফেলা অভিনেতা এক কথায় ছিলেন ভারসাটাইল অভিনেতা। কাল হো না হো, দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে সহ অসংখ্য চলচ্চিত্রে তাঁর প্রতিভার স্বাক্ষর রয়েছে।

কামিনী কৌশল : দিলীপ কুমার দেব আনন্দ ও রাজ কাপুরের একাধিক চলচ্চিত্রের নায়িকা ছিলেন তিনি। এইসব চলচ্চিত্রের মধ্যে শহীদ,আরজু,জিদ্দি,আগ প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। ১৯৪৬ সালে নায়িকার চরিত্রে অভিনয় করে হিন্দি চলচ্চিত্র জগতে পা রেখেছিলেন, অতঃপর ৭৬ বছর ধরে বহুমুখী চরিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি। এবছর ১৩ নভেম্বর, ৯৮ বছর বয়সে প্রয়াত হয়েছেন কামিনী কৌশল। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক একাধিক পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন তিনি।

ধর্মেন্দ্র : নভেম্বর মাসেই চলে গেলেন ভারতীয় চলচ্চিত্রের হিম্যান ধর্মেন্দ্র। ৮ ডিসেম্বর ছিল তাঁর জন্মদিন।  ৯০ তম জন্মদিনের দু সপ্তাহ আগে, ২৪ নভেম্বর  প্রয়াত হন তিনি।এবছর ও একাধিক চলচ্চিত্রে দেখা গিয়েছে তাঁকে। দীর্ঘ সময় ধরে তিনশোর বেশি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি। এই দীর্ঘ তালিকায় বিরু হয়ে শোলে চলচ্চিত্রে  শুধু নয়, অসংখ্য সফল এবং জনপ্রিয় চলচ্চিত্রে অভিনয় করে মাতিয়েছেন দর্শকদের। রোমান্টিক বা অ্যাকশন হিরো দু ধরণের ধারায় সমান স্বচ্ছন্দ এবং রোমান্টিক বা রাফ এন্ড টাফ নায়ক – যেকোনও দিক থেকেই দর্শকদের কাছে সমান গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছিলেন ধর্মেন্দ্র। সানি দেওল- ববি দেওলের পিতা এবং হেমামালিনীর জীবনসঙ্গী ধর্মেন্দ্র প্রয়াত হলেও তাঁর প্রভাব থেকে যাবে হিন্দি চলচ্চিত্রে।জন্ম পাঞ্জাবের লুধিয়ানায়। প্রায় সাত দশকের ফিল্ম ক্যারিয়ারের শুরু ১৯৬০ সালে দিল ভি তেরা হাম ভি তেরে চলচ্চিত্র দিয়ে, বড় মাপের পুরস্কার না পেলেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং অবশ্যই হিন্দি চলচ্চিত্রর ইতিহাসে  সর্বকালের শ্রেষ্ঠ নায়কদের মধ্যে অন্যতম।

এবার আসা যাক  প্রাদেশিক চলচ্চিত্রে :

কোটা শ্রীনিবাস রাও : প্রখ্যাত তেলেগু অভিনেতা ৮৩ বছর বয়সে, ১৩ জুলাই, ২০২৫ তারিখে হায়দ্রাবাদে বার্ধক্যজনিত অসুস্থতার কারণে প্রয়াত হয়েছেন। তিনি তেলেগু ছাড়াও তামিল, কন্নড় এবং হিন্দি সহ বিভিন্ন ভাষার চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। ৭৫০টিরও বেশি চলচ্চিত্রে তিনি তাঁর অভিনয় প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন।

শ্রীনিবাসন : প্রখ্যাত মালয়ালম অভিনেতা তথা পরিচালক শ্রীনিবাসন ২০ ডিসেম্বর ৬৯ বছর বয়সে কেরলে নিজের বাসভবনেই প্রয়াত হন  । প্রায় পাঁচ দশকের বেশি সময়কালে অভিনয় করেছেন ২২৫টিরও বেশি ছবিতে।

২০২৫ সালে বাংলা চলচ্চিত্র জগতও হারিয়েছে খ্যাতনামা একাধিক অভিনেতা- অভিনেত্রীকে, এদের মধ্যে দুজনের কথা স্মরণ না করলেই নয়!

জয় ব্যানার্জী : রাজনীতিতে এলেও রাজনীতির সঙ্গে ঠিক খাপ খাইয়ে নিতে পারেননি তবে খুব অল্প বয়সেই চলচ্চিত্র জগতে নায়ক হিসেবে সাড়া ফেলেছিলেন জয় ব্যানার্জী। হীরক জয়ন্তী বা মিলন তিথি -তাঁর অভিনীত চলচ্চিত্র গুলির মধ্যে মধ্যে উল্লেখযোগ্য। ‘চপার’ চলচ্চিত্রে তাঁর অভিনয় চলচ্চিত্র সমালোচকদের প্রশংসা কেড়ে নিয়েছিল। ২৫ আগস্ট মাত্র ৬২ বছর বয়সে প্রয়াত হন জয় ব্যানার্জী।

কল্যাণ চ্যাটার্জী : ৭ ডিসেম্বর ৮৩ বছর প্রয়াত হয়েছেন বাংলা চলিত চলচ্চিত্রের উল্লেখযোগ্য নাম কল্যান চ্যাটার্জি। আপনজন, ধন্যি মেয়ে, সবুজ দ্বীপের রাজা –  বিভিন্ন ধরনের চলচ্চিত্রের হরেক রকম  চরিত্রে তিনি ছিলেন সপ্রতিভ।  সত্যজিৎ রায়ের ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছিলেন তিনি। ৪০০ বেশি বাংলা সিনেমায় অভিনয় করেছেন। বাংলার বিখ্যাত পরিচালকদের প্রায় প্রত্যেকের চলচ্চিত্রে তাঁকে দেখা গিয়েছে।

 

বিদেশের চলচ্চিত্রে : বলিউড যেমন হারিয়েছে বহু খ্যাতনামা ব্যক্তিত্বকে, হলিউডের তারার দেশে তারকাদের  পাড়ি দেওয়ার তালিকা বেশ দীর্ঘ।

ভাল কিলমে : টপ গান বা ব্যাটম্যান ফর এভার সহ একাধিক চলচ্চিত্রে কেন্দ্রীয় ভূমিকায় অভিনয় করেছেন তিনি। ভাল কিলমে ১ এপ্রিল ৬৫ বয়সে প্রয়াত হয়েছেন।

গ্রাহম গ্রীন : ক্যানাডার বিশ্ববরেন্য  অভিনেতা গ্রাহাম গ্রীন সেপ্টেম্বর মাসের ১ তারিখে  ৭৩ বছরে প্রয়াত হন।  ডান্সস উইথ উল্ভসে কিকিং বার্ড বা দ্যা গ্রীন মাইল সহ একাধিক চলচ্চিত্রে অসামান্য অভিনয় করে গিয়েছেন তিনি।

রবার্ট রেডফোর্ড – দ্যা স্টিং, দ্যা ওয়ে উই ওয়ার বা অর্ডিনারি পিপল – ভোলা যাবে না অভিনেতা রবার্ট রেডফোর্ডকে। অভিনেতা -পরিচালক -প্রযোজক ও ব্যবসায়ী এক অঙ্গে একাধিক রূপ। ১৬ সেপ্টেম্বর ৮৯ বছর বয়সে প্রয়াত হয়েছেন তিনি। সানডান্স চলচ্চিত্র উৎসবের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন রবার্ট রেডফোর্ড।

ডায়ান কিটন : গডফাদারের আলপাচিনো-র অভিনয় কার না মনে আছে! তাঁর স্ত্রীর চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন ডায়ান কিটন। তবে উডি অ্যালেনের অ্যানি হলের জন্য তিনি বেশি খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। অস্কার সহ একাধিক বিশ্বসেরা পুরস্কার পেয়েছেন কিটন।  ১ অক্টোবর ৭৯ বছর বয়সে প্রয়াত হয়েছেন তিনি।।

ব্রিজিত বার্দো : বারংবার অসুস্থ হয়ে পড়ছিলেন তিনি। ক্রমান্বয়ে চলছিল বাড়ি আর হাসপাতাল। অবশেষে ফ্রান্সের সেইন্ট ট্রপেজে লড়াই শেষ হয়ে গেল ফরাসি অভিনেত্রীর। ব্রিজিত বার্দো ৯১ বছর বয়সে মৃত্যুর কাছে হার মানলেন।তাঁর অভিনীত ” এন্ড গুড ক্রিয়েটেড ওমেন ” চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। তাঁর বর্ণময় জীবন ও চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। ২৮ ডিসেম্বর শেষ ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে পড়লেন তিনি।

যাদের কথা স্মরণ করা হল তাঁরা প্রত্যেকেই অভিনয়দক্ষতায় বা তাঁদের স্বীয় প্রতিভায় চলচ্চিত্রে দাগ রেখে গিয়েছেন। তাঁরা নেই, কিন্তু তাঁরা থেকে যাবেন তাঁদের কাজের মধ্যে দিয়ে, অবদানের মধ্যে। অনেকের কথা স্থানাভাবে উল্লেখ করা সম্ভব হল না। তারার দেশের তারকাদের জন্য সময় কলকাতার ২০২৫ সালের বিনীত শ্রদ্ধার্ঘ্য।।

আরও পড়ুনফিরে দেখা ২০২৫ : সেলিব্রিটিদের রহস্যময় মৃত্যুর বছর

 

About Post Author