Home » নিষিদ্ধনগরী বৌদ্ধ সন্ন্যাসিনীদের গুম্ফায়

নিষিদ্ধনগরী বৌদ্ধ সন্ন্যাসিনীদের গুম্ফায়

সুমিত্র বন্দ্যোপাধ্যায় (অতিথি লেখক), সময় কলকাতা ডেস্কঃ “জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপি গরীয়সী।” শিকড়ের টান, মাতৃভাষার টান আজও রয়ে গেছে। তবে মাতৃভূমি আর ‘নিষিদ্ধনগরী’ এখন চিনাদের দখলে। লাসা, ওঁদের উচ্চারণে ‘হাস্সা’ ছিল তিব্বতের রাজধানী। সেখানে বিদেশিদের ঢোকার অধিকার ছিল না, আর ছিল না বলেই তা ছিল বিদেশিদের কাছে নিষিদ্ধনগরী। এখন সেই নগরীতে ব্রাত্য তিব্বতিরীই। পুরনো মানচিত্রে ভারতের উত্তর অংশ জুড়ে বিস্তৃত রয়েছে তিব্বতভূমি। দুনিয়ার সবচেয়ে বড় মালভূমি। আধুনিক মানচিত্রে তার নামের অস্তিত্ব প্রায় নেই। তবে ভারতের অরুণাচলপ্রদেশে তাদের একান্ত সংস্কৃতি এখনও বজায় রয়েছে। এদেশে ‘নানা ভাষা নানা মত নানা পরিধানে’র মধ্যে যে স্বাতন্ত্র্য রয়েছে, সেই স্বাতন্ত্র্য বজায় রয়েছে অরুণাচলপ্রদেশেও।
তিব্বতি ভাষাতেই বৌদ্ধধর্মের চর্চা হয় অরুণাচলপ্রদেশে। লাসার পরেই বিশ্বের সবচেয়ে বড় বৌদ্ধ মন্দির বা মনাস্ট্রি রয়েছে অরুণাচল প্রদেশের তাওয়াং জেলায়। নাম তাওয়াং গুম্ফা। মাতৃভাষাতেই তাঁরা চর্চা করেন নিজ ধর্মের। তবে দুনিয়ার সঙ্গে তাল মেলাতে এখন তাঁরা ইংরেজি ও হিন্দি ভাষার চর্চাও শুরু করেছেন।

তাওয়াং শহর থেকে ন’কিলোমিটার দূরে ব্রমডুংচুং গুম্ফা, পর্যটকদের কাছে আনি গুম্ফা নামে পরিচিত। এখানে একসময় প্রায় কিছুই ছিল না। বছর কুড়ি আগে সরকারি সহায়তায় আনি গুম্ফার কিছুটা উন্নতি হয়েছে। উন্নতি মানে গুম্ফার কাঠামো একটু ভাল হয়েছে, এই যা। তবে এর জন্য কোনও দরবার করেননি আনি বা বৌদ্ধ সন্ন্যাসিনীরা। সাকুল্যে জনা পঞ্চাশের কম এখানে থাকেন। চার-পাঁচ জন করে একসঙ্গে থাকা-খাওয়া করেন। নিজেদের সব কাজ নিজেদেরই করতে হয়। নিরামিষ খাওয়া। স্নান-পুজো সেরে সুর করে পড়েন তিব্বতি ভাষায় লেখায় ধম্মপদ পুঁথি। কয়েকশো বছর পেরিয়ে যাওয়া পুঁথি হলুদ হয়েছে। ভেঙে যায়নি। বড় আনিরা সব কাজেই ছোট আনিদের সাহায্য করেন। তাঁদের মধ্যে সম্পর্ক স্নেহ-শ্রদ্ধা-মমতার।

আনিরা অধিকাংশই মোংপা উপজাতির মেয়ে। অনেকে আসেন তিব্বত সীমান্ত পার হয়ে, লুকিয়ে। আসলে ধর্ম ও স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করতে মা-বাবাই তাঁদের ঠেলে দেন বিপদসঙ্কুল পথে, ভারতের দিকে। ভারত, মানে যেখানে থাকেন দলাই লামা। যেখানে গেলে তাঁরা বলতে পারবেন নিজের ভাষায় কথা, রক্ষা করতে পারবেন নিজেদের সংস্কৃতি।
কারও তিনটি বা তার বেশি মেয়ে হলে, দ্বিতীয়া কন্যাকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় গুম্ফায়। এটাই রীতি। তারপরে ধীরে ধীরে সেই দ্বিতীয় কন্যা বড় হতে থাকেন আনিদের স্নেহে। কেউ সারাজীবন সেখানেই থেকে যান। তবে বাড়িতে যেতে, বাড়ির মানুষের সাথে কথা বলতে কোনও বাধা নেই। তবে সংসারী হতে একটু বাধা রয়েছে বৈকি। তারপরেও কেউ যদি প্রেমে পড়ে যান?
এমন প্রশ্ন শুনে হেসেছিলেন কেসাং খিরমু। তিনি আনি। মানে আনি কেসাং খিরমু। হাসতে হাসতে বলেছিলেন, “তখন আর কী! জরিমানা দিতে হয়। এক হাজার টাকা ও এক বস্তা চাল। না দিলেও কোনও জোরাজুরি নেই।”

মোংপা উপজাতির কুর্পা নামে এক যুবকের বোনও আনি। তিনি বলেছিলেন, “বাড়িতে আমার বোন আসে, নিরামিষ খায়। এতে কোনও বাধা নেই।”

১৫৯৫ সালে কার্চেন ইয়েশি গেলেক নামে এক ব্যক্তি এই গুম্ফা প্রতিষ্ঠা করেন। তখন থেকেই পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও ধর্ম ও ভাষাচর্চা শুরু করেন প্রাতিষ্ঠানিকভাবে।
ঐতিহ্য মেনে আজও গুম্ফার শিখরে ওড়ে স্বাধীন তিব্বতের পতাকা। এটা কোনও দেশের প্রতীক নয়, এ তাঁদের কাছে ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রতীক।
তিব্বত থেকে ভারতে আসার পথ সহজ নয়। অনুপ্রবেশকারী হিসেবে ধরা পড়ার কথা না হয় বাদই দেওয়া হল, কিন্তু এই পথে একা, বা বছর পাঁচেকের তিন-চারজন ছেলে-মেয়েকে কোন ভরসায় পাঠান তিব্বতি মা-বাবা? কেসাং বললেন, “কেন, গৌতম বুদ্ধ আর দালাই লামার ভরসায়। তাঁরাই তো আমাদের রক্ষা করেন।”

About Post Author