Home » সত্যজিৎ রায় কেন এত সফল ও জনপ্রিয় ?

সত্যজিৎ রায় কেন এত সফল ও জনপ্রিয় ?

পুরন্দর চক্রবর্তী, সময় কলকাতা,২৩ এপ্রিল : ” অনেক নতুনের ভিড়ে পুরোনো খাঁটি জিনিসের কদর কমে যাচ্ছে। ” সত্যজিৎ রায় পুজোর ছুটিতে গান শোনা প্রসঙ্গে ‘অবসরে’ নামক নিবন্ধে এমনটাই বলেছিলেন। আজ বহুমুখী প্রতিভা ও  সফল চলচ্চিত্র পরিচালক ও লেখক সত্যজিৎ রায়ের প্রসঙ্গে কথা উঠলে তবুও বাঙালির তাঁকে নিয়ে স্মৃতিমেদুরতা কমে না। মৃত্যুর ৩১ বছর পরেও তিনি পুরোনো হন না, কদর কমার প্রশ্নই ওঠে না। ২৩ এপ্রিল, সত্যজিৎ রায়ের প্রয়াণ দিবসে তাঁর সাফল্যের ধারাপাত পড়ার চেষ্টা, তাঁকে আরেকবার জানার চেষ্টা- তাঁকে শ্রদ্ধা জানানোর পথ হয়ে উঠতে পারে।

আরও পড়ুন : কিংবদন্তী চলচ্চিত্র পরিচালক গদার প্রয়াত

বাঙালি মানসিকভাবে উদ্দীপ্ত হতে বরাবরই বন্দনা করে এসেছে মনীষীদের। বঙ্কিমচন্দ্র “নবদ্বীপে চৈতন্য চন্দ্রোদয়কে বাঙালির রেনেসাঁ আখ্যা দিয়েছিলেন। চৈতন্যদেব থেকে শুরু করে স্বাধীনতার সময় পর্যন্ত অনেক আইকন পেয়েছে বাঙালি । এঁদের মধ্যে রয়েছেন রবীন্দ্রনাথ, নেতাজি সুভাষচন্দ্র। এবং উল্লেখ্য, বাঙালি “মানসিক উদ্দীপ্তি” পেয়েছে সত্যজিৎ রায়ের মধ্যেও। তিনি বিশ্ববন্দিত, ভারতের গর্ব এবং ছিলেন বাঙালির আপনজন। তিনি উল্লেখযোগ্য ভাবে  স্বাধীনতার পরবর্তী পর্বে হয়ে উঠেছিলেন বাঙালির আইকন।তাঁকে আমরা পেয়েছি মূলত চলচ্চিত্র নির্মাতা, লেখক, সুরকার এবং চিত্রকর হিসেবে। ভার্সাটাইল বলতে যা বোঝায়, তাই ছিলেন তিনি।

আরও পড়ুন : হিন্দি চলচ্চিত্রের বিখ্যাত বাঙালি অভিনেত্রীর প্রয়াণ

তাঁর আঁকা ছবি কথা বলত, রায় পরিবারের ঐতিহ্য মেনেই সন্দেশ পত্রিকায় কত-ই ছবি না তাঁর প্রকাশিত হয়েছে। স্কেচ আঁকায় সুদক্ষ ছিলেন। পুস্তকের প্রচ্ছদ অঙ্কনে তার মত পটু কজনই বা ছিলেন!  এ প্রসঙ্গে জীবনানন্দ দাশের ‘বনলতা সেন’ বা বিভূতিভূষণের ‘আম আঁটির ভেঁপু”র কথা উল্লেখ না করলেই নয়।

আরও পড়ুন :বিশ্ব বই দিবস ও অধুনা লুপ্ত বইবাজার

বলাই বাহুল্য,সত্যজিৎ রায়ের ফেলুদা বাঙালির বড্ড আপনজন। শুধু ফেলুদাই বা কেন, তোপশে, জটায়ু, মগনলাল মেঘরাজকে চেনে না এহেন কিশোর কিশোরী বঙ্গে খুব কম। ‘ক্লাস ফ্রেন্ডের’ মত মরমিয়া গল্প তিনি লিখেছেন। লিখেছেন ‘খগম’ বা ‘সাধন বাবুর সন্দেহ’র মত বহু মনস্তাত্ত্বিক গল্প। তারিণীখুড়োও তাঁর সৃষ্টি। আর লেখক হিসেবে সত্যজিৎ রায়ের উল্লেখ করতে গিয়ে অবশ্যই বলতে হবে প্রফেসর শঙ্কুর কথা। শঙ্কু কাহিনীতে যুগের চেয়ে এগিয়ে অদ্ভুত অদ্ভুত উদ্ভাবনীর কথা বলে গিয়েছেন সত্যজিৎ তাঁর সুললিত ভাষায়।

আরও পড়ুন : মতি নন্দীর লেখা আজও পাঠকের কাছে দায়বদ্ধ থাকার প্রতিশ্রুতি

এ নিয়ে সন্দেহ থাকতে পারে না যে তাঁর নায়ক, চিড়িয়াখানা, গণশত্রু, আগন্তুক, সীমাবদ্ধ, গুপী গাইন বাঘা বাইন, কাপুরুষ ও মহাপুরুষ, জয় বাবা ফেলুনাথ, সোনার কেল্লা তাঁকে বেশ সুখ্যাতি দিয়েছে। কিন্তু এত সফল, জনপ্রিয় কেন তিনি? কেন তিনি আইকন? কেন বুদ্ধদেব গুহ তাঁকে ‘ওভাররেটেড’ আখ্যা দিলেও বাঙালির কাছে তিনি অন্যতম প্ৰিয় ব্যক্তিত্ব? খ্যাতি তো খালি তাঁর পার্সোনালিটি দিয়ে আসে নি, তাঁর দীর্ঘদেহী সুদর্শন চেহারার জোরেও আসে নি।কী ছিল সেই রসায়ন?

আরও পড়ুন : স্মরণে গুরু দত্ত, রইল কিছু অজানা কথা

যে যে ধারায় তিনি কিছু দাগ রাখার প্রচেষ্টা করেছেন সেখানেই তিনি সফল। তবুও লেখক বা চিত্রকর সত্যজিৎ রায়ের  পাশাপাশি মনে রাখতে হবে চলচ্চিত্র পরিচালক সত্যজিৎ রায় কে।তাঁর প্রধান খ্যাতি চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবেই। তাঁর লেখালেখি বেশ কিছুটা পরে শুরু হয় বা খ্যাতি পায় । জীবনের শেষ তিন দশক তিনি ধারাবাহিক ভাবে ফেলুদা বা প্রফেসর শঙ্কুর কাহিনী লিখেছেন। প্রাথমিকভাবে খ্যাতি তিনি পেয়েছিলেন সেই ১৯৫৫ সালেই যখন তিনি “পথের পাঁচালী”কে পর্দায় তুলে ধরেছিলেন। তাঁর সেই খ্যাতি অপু ট্রিলজিতে বা অন্য চলচ্চিত্র পরিচালনায় ছিল অব্যহত এবং চলচ্চিত্রের মাধ্যমেই তিনি সর্বোচ্চ স্তরের আন্তর্জাতিক খ্যাতিও কুড়িয়েছেন ।

আরও পড়ুন :  বৃন্দাবন বিলাসিনী রাই কাবেরী বসু

সাধারণভাবে বিচার করলে বলতেই হবে -চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবে তাঁর সাফল্যের কারণ ছিল খুব সরল।তিনি মনে করতেন যাকে দিয়ে যা হয় না তা করানোর চেষ্টা অনর্থক ও এতে হিতে বিপরীত হয়। তিনি নিজেই লিখে গিয়েছেন,’ আমাদের দেশের ছবিতে অনেক দুর্বল অভিনয়ের কারণ হচ্ছে এই যে যাকে দিয়ে যা হয় না তাকে দিয়ে ঠিক সেইটেই করিয়ে নেওয়ার চেষ্টা।”আর এখান থেকেই উত্তরণের পথ খুঁজেছেন তিনি। তিনি নিজেই জানিয়েছেন ‘পথের পাঁচালী’ আর ‘অপরাজিত’- তে যে পরিমাণ অপেশাদারী প্রৌঢ় ও বৃদ্ধ অভিনেতাদের সংস্পর্শে আসতে হয়েছিল, তেমন অবিশ্যি আর কোনও ছবিতেই হয় নি। ” অথচ এই দুটি ছবি সত্যজিৎ রায়ের করা অন্যতম সেরা ছবি শুধু নয়, ভারতীয় চলচ্চিত্রের সর্বকালের শ্রেষ্ঠ ছবিগুলির অন্যতম।

‘আরও পড়ুন : অভিনেত্রী মহুয়া রায়চৌধুরীর মৃত্যুরহস্য : প্রশ্নই যেখানে উত্তর

অপরাজিত’ তে যেভাবে তিনি কমিক অভিনেতা হিসেবে খ্যাত কালী বন্দ্যোপাধ্যায়কে পুরুতের চরিত্রে ব্যবহার করিয়েছিলেন তা থেকেই পরিষ্কার কাকে দিয়ে কী হয় সেই বোধ বোধহয় তাঁর চেয়ে ভালো কারও ছিল না। উল্লেখ করা যেতে পারে, তারাশঙ্কর রচিত জলসাঘরের সুদক্ষ চলচ্চিত্রায়নে যেভাবে ছবি বিশ্বাসকে ব্যবহার তিনি করেছিলেন তা তাঁর পক্ষেই সম্ভব । সত্যজিৎ নিজেই জানিয়েছিলেন, ” ছবি বাবুর মত অভিনেতা না থাকলে ” জলসাঘরের চিত্ররূপ দেওয়া সম্ভব হত কিনা তাঁর জানা নেই। দেবী ও কাঞ্চনজঙ্ঘার পাশাপাশি এই যে সঠিক মানুষকে সঠিক ভাবে ব্যবহার তা সত্যজিৎ রায়ের চেয়ে ভালো কে জানত!তিনি এজন্যই সফল হয়েছিলেন, কারণ তিনি জানতেন ও তিনি মানতেন, ” আমাদের দেশের একটা বিশেষ ট্রাজেডি হল এই যে, এখানে সৎ অভিনেতা – অভিনেত্রীর সংখ্যা সৎ পরিচালক বা চিত্রনাট্যকারদের চেয়ে অনেক বেশি, ফলে তাদের যোগান দেওয়ার লোকের অভাব “। তিনি এই বাধা অতিক্রমের চেষ্টা করেছেন, তাই তুলসী চক্রবর্তী “পরশ পাথর” হয়ে রয়ে গিয়েছেন। তুলসী চক্রবর্তীর প্রয়াণ প্রসঙ্গে সত্যজিৎ রায় লিখেছিলেন,”.. যারা হাস্যরস পরিবেশন করেন, তাঁদের মধ্যে দক্ষ অনেকেই আছেন, কিন্তু তুলসীবাবুর জায়গা নেওয়ার কেউ নেই, কেউ ছিল না , কেউ হয় নি, কেউ হবে না। ” তুলসী চক্রবর্তী সত্যজিৎ রায়ের কাছে ভালো কাজ পেয়েছিলেন। শুধু কালী বন্দ্যোপাধ্যায়,ছবি বিশ্বাস, তুলসী চক্রবর্তী নয়। ভালো অভিনেতাদের ভালো কাজ না পাওয়ার ট্র্যাজেডি দূর করাই যেন ছিল সত্যজিৎ রায়ের অন্যতম ব্রত। এ প্রসঙ্গে জটায়ু বা সন্তোষ দত্তের কথা মনে পড়তে বাধ্য। মনে পড়তে পারে কামু মুখার্জীর কথা।যাকে দিয়ে যা হয় না তা করানো এবং সততা না থাকাই ভালো কাজের অন্তরায় মনে করে এসেছেন সত্যজিৎ রায় , তাই ঠিক নিজের মত করে গতানুগতিক প্রথা ভেঙেছেন আপন ছন্দে। আর তাই সাফল্যের অন্য নাম সত্যজিৎ রায়। তাই তো তিনি আইকন।।

আরও পড়ুন : প্রেতাত্মা দেখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ সহ বহু বিখ্যাত লেখক

About Post Author